নকশালবাড়ির ৬০ বছর: উত্তরবঙ্গের স্ফুলিঙ্গ থেকে অন্ধ্রের যবনিকা একটি রক্তাক্ত অধ্যায়ের ইতি

ষাটের দশকে উত্তরবঙ্গের নকশালবাড়ি থেকে যে সশস্ত্র সংগ্রামের স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠেছিল, তা এক সময় দাবানল হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা ভারতে। সেই আন্দোলনের শেষ অধ্যায়টি নিঃশব্দে রচিত হলো গত ফেব্রুয়ারিতে অন্ধ্রপ্রদেশের জঙ্গলে। মাওবাদী আন্দোলনের শেষ গুরুত্বপূর্ণ নেতা দেবুজির আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে কি তবে ইতি ঘটল ছয় দশকের এক রক্তাক্ত অধ্যায়ের? বাঙালির মনন ও ভারতের রাজনীতিতে এই আন্দোলনের উত্থান ও পতন নিয়ে আমাদের আজকের বিশেষ প্রতিবেদন। ১৯৬৭ সাল। উত্তরবঙ্গের নকশালবাড়িতে একদল বিপ্লবী কৃষক জমি ও ফসলের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে হাতে তুলে নিয়েছিলেন অস্ত্র। তৎকালীন ‘রেডিও পিকিং’ ঘোষণা করেছিল— ‘ভারতের বুকে বিপ্লবের বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ’। চারু মজুমদার, কানু সান্যালদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া সেই আন্দোলন দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল বাংলার ছাত্রসমাজ থেকে শুরু করে অন্ধ্র, বিহার ও ওড়িশার প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে। প্রেসিডেন্সি কলেজ বা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্ররা উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ছেড়ে ‘মুক্তাঞ্চল’ গড়ার নেশায় পাড়ি জমিয়েছিলেন গ্রামে।গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরার যে ডাক দেওয়া হয়েছিল, তার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছিল কলকাতায়। সত্তরের দশকে শহরটি হয়ে উঠেছিল এক ‘মৃত্যু উপত্যকা’। একদিকে শ্রেণিশত্রু খতমের নামে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, অন্যদিকে পুলিশের কঠোর দমননীতি। বিদ্যাসাগর থেকে গান্ধী— মূর্তিবিনাশের রাজনীতি আর ‘৭০-এর দশককে মুক্তির দশকে’ পরিণত করার আবেগে উত্তাল হয়ে উঠেছিল বাংলা। কিন্তু তিমিরবরণ সিংহের মতো বহু মেধাবী তরুণের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল এই আন্দোলন। রাষ্ট্র নামিয়েছিল ‘অপারেশন স্টিপল চেজ’। ১৯৭২ সালের মধ্যেই চারু মজুমদারের মৃত্যু আর গণবিচ্ছিন্নতার কারণে বাংলার সমতলে এই আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে।দীর্ঘ বিরতির পর নব্বইয়ের দশকে অন্ধ্রের ‘জনযুদ্ধ’ গোষ্ঠী আর বিহারের ‘এমসিসি’ মিলে তৈরি করে সিপিআই (মাওবাদী)। ২০০৮ সালে জঙ্গলমহলে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কনভয়ে ল্যান্ডমাইন হামলার মধ্য দিয়ে বাংলায় মাওবাদীদের শক্তিশালী প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত মেলে। কিষেণজির নেতৃত্বে লালগড় আন্দোলন রাষ্ট্রশক্তিকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়। কিন্তু ২০১১ সালে কিষেণজির মৃত্যু এবং নতুন সরকারের ‘উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের’ নীতির কাছে পিছু হটতে বাধ্য হয় তারা।অন্ধ্রপ্রদেশে দেবুজির আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে একটি সামরিক লড়াইয়ের হয়তো অবসান ঘটল, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়— যে বঞ্চনা ও ক্ষোভ থেকে এই আন্দোলনের জন্ম হয়েছিল, তা কি পুরোপুরি নির্মূল হয়েছে? বাঙালির স্মৃতিতে নকশাল আন্দোলন এখন কেবলই এক ধূসর ইতিহাস বা সাহিত্যের উপাদান। তবে ইতিহাসের এই শিক্ষা স্পষ্ট— কেবল অস্ত্রের জোরে নয়, মানুষের মন জয় করা যায় একমাত্র উন্নয়নের অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমেই।