গ্রন্থ পর্যালোচনা: কিংডম ফরমেশন ইন প্রিকলোনিয়াল ইণ্ডিয়া: এ হিস্ট্রিক্যাল স্টাডি অফ দি কোচ কিংডম সি. ১৫৪০-১৭৭৩

ড. কৃষ্ণ কুমার সরকার
সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইতিহাস বিভাগ (পি. জি.)
রাজা নরেন্দ্রলাল খান মহিলা মহাবিদ্যালয় (স্বশাসিত)

গত কয়েক দশক ধরে রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়া সংক্রান্ত আলোচনা ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিকদের মনোযোগ আকর্ষণ করে চলেছে। সেই ধারায় নতুন সংযোজন হলো অধ্যাপক রূপ কুমার বর্মণের সদ্য প্রকাশিত গ্রন্থ: কিংডম ফরমেশন ইন প্রিকলোনিয়াল ইণ্ডিয়া: এ হিস্ট্রিক্যাল স্টাডি অফ দি কোচ কিংডম সি. ১৫৪০-১৭৭৩। এই গ্রন্থে লেখক প্রাক্-ঔপনিবেশিক ভারতে রাজ্য গঠন প্রক্রিয়ার ইতিহাসকে এক স্বতন্ত্র দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে রাজ্য গঠনের একটি বিকল্প সূত্রের সন্ধান দিয়েছেন।

গ্রন্থটি সাতটি অধ্যায়ে বিভক্ত।প্রথম অধ্যায়ে অধ্যাপক বর্মণ রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়ার তাত্ত্বিক ভিত্তি উপস্থাপন করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে পণ্ডিতরা ভারতে প্রাথমিক ও গৌণ রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়া উপলব্ধির জন্য একাধিক তাত্ত্বিক কাঠামো—যেমন: সাংস্কৃতিক নৃতাত্ত্বিকদের বিবর্তনবাদী মডেল, সামন্তবাদের মার্ক্সীয় ধারণা এবং খণ্ডিত-রাষ্ট্রের ধারণা—ব্যবহার করেছেন। অধ্যাপক বর্মণ উল্লেখ করেছেন যে মধ্যযুগীয় ভারতের রাজ্যগুলো গবেষণার আকর্ষণীয় ক্ষেত্র হলেও, সীমান্তবর্তী অঞ্চলে—বিশেষত মধ্যযুগীয় সময়ে—রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়া কেন্দ্রীয় অঞ্চলের রাজ্যগুলির থেকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বহন করত। এই কারণে, তিনি প্রাক্-ঔপনিবেশিক ভারতে রাজ্য গঠনের সাধারণ কারণগুলোর পাশাপাশি, প্রাক্-আধুনিক উত্তর-পূর্ব ভারতে রাজ্যগুলোর উত্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো বিশদভাবে তুলে ধরেছেন।
দ্বিতীয় অধ্যায়ে, প্রাক্-ঔপনিবেশিক তিস্তা-ব্রহ্মপুত্র অঞ্চলের ভূ-ঐতিহাসিক অবস্থান ও সামাজিক প্রেক্ষাপট সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, যেকোনো অঞ্চলের ঐতিহাসিক বিবর্তন তার প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে অনিবার্যভাবে জড়িত। এই ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যগুলি মানব সভ্যতার উৎপত্তি ও বিকাশের ওপর অপরিসীম প্রভাব ফেলায়, ভূগোলকে একটি নির্দিষ্ট সভ্যতার জীবনযাত্রার অন্যতম নির্ধারক কারণ হিসেবে গণ্য করা যায়। তিস্তা-ব্রহ্মপুত্র নদীর অববাহিকা এর ব্যতিক্রম নয়। কাজেই, এই অধ্যায়ে তিনি এই অঞ্চলে রাজ্যগুলির উৎপত্তি ও বিবর্তনের ধারণা দেওয়ার জন্য প্রাক্-ঔপনিবেশিক তিস্তা-ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার ভূ-ঐতিহাসিক পটভূমি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন।
অধ্যাপক বর্মণ তৃতীয় অধ্যায়ে কোচ রাজ্য গঠনের প্রক্রিয়া অনুধাবনের জন্য তিস্তা-ব্রহ্মপুত্র অঞ্চলের কোচ রাজত্ব প্রতিষ্ঠার পূর্বের রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলি বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই তিস্তা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা মানব বসতিতে সমৃদ্ধ ছিল। এই অঞ্চলের উপনিবেশ-পূর্ব ইতিহাসে এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষের ধারাবাহিক অভিবাসন দেখা যায়। বিভিন্ন জাতিগত ও সাংস্কৃতিক সম্প্রদায়ের মিশ্রণ এই অঞ্চলের জনসংখ্যার জটিলতা বৃদ্ধি করেছিল, যা নিঃসন্দেহে এখানে গৌণ রাজ্য গঠনে সহায়তা করে। এই অধ্যায়ে তিনি কৌমরাজ্য থেকে সাম্রাজ্য গঠনের প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক সংগঠনগুলির ভূমিকা লিপিবদ্ধ করেছেন।

চতুর্থ অধ্যায়ে অধ্যাপক বর্মণ ১৫৪০ থেকে ১৭৭৩ সাল পর্যন্ত কোচ রাজ্যের উত্তরণ ব্যাখ্যা করেছেন। বিশ্বসিংহ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই রাজ্যটি তাঁর পুত্র নর নারায়ণের রাজত্বকালে (১৫৪০-৮৭ খ্রিস্টাব্দ) ভাই চিলা রায়ের সহযোগিতায় আক্রমণাত্মক যুদ্ধ, সাধারণ মুদ্রা প্রবর্তন, এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে একটি সুসংহত একীভূত রাষ্ট্র ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয়। এই প্রক্রিয়ায় উত্তর-পূর্ব ভারত থেকে ধনসম্পদ সংগ্রহ ও অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে, ১৫৮১ খ্রিস্টাব্দে নর নারায়ণ ও চিলারাইয়ের উত্তরসূরিদের মধ্যে হওয়া রাজ্য বিভাজন এবং আন্তঃসম্পর্কীয় দ্বন্দ্বের ফলে কোচ রাজ্যের ক্ষমতা ও আয়তন হ্রাস পায়। তা সত্ত্বেও, প্রধান শাখার শাসকেরা আহোম, মুঘল ও ভুটানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তাঁদের স্বাধীন অবস্থান বজায় রাখতে সক্ষম হন।
পঞ্চম অধ্যায়ে অধ্যাপক বর্মণ একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও পদ্ধতির মাধ্যমে কোচ রাজ্যের অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব সমালোচনামূলকভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, যুদ্ধ ও নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ হলেও, রাজ্যের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা মূলত আদিবাসীদের কৃষিজীবীকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সৃষ্ট উদ্বৃত্ত-উৎপাদনকারী কৃষি অর্থনীতির উপর নির্ভরশীল ছিল। প্রযুক্তিগত সংস্কার এবং কারুশিল্পে বিশেষীকরণ এই কৃষিজীবীকরণ প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছিল, যা আদিবাসী সম্প্রদায়ের সংস্কৃতায়নের সঙ্গেও যুক্ত ছিল। এছাড়াও, নারায়ণী তঙ্কা নামে একটি সাধারণ মুদ্রা প্রবর্তনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক লেনদেনের নগদীকরণ ঘটে, যা ব্যবসা-বাণিজ্যের বৃদ্ধি এবং রাজ্যের উত্থানের জন্য প্রয়োজনীয় কৃষি-সাংস্কৃতিক উদ্বৃত্তের বণ্টনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
ষষ্ঠ অধ্যায়ে অধ্যাপক বর্মণ রাজ্য গঠন, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং নেতৃত্বের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের মধ্যেকার সম্পর্ক একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন। প্রাক্-ঔপনিবেশিক ভারতীয় সাম্রাজ্যের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্যগুলি কোচ রাজ্যে কৌম-প্রধানতন্ত্রের উপর উপজাতীয় নিয়ন্ত্রণ অপসারণের মাধ্যমে সুদৃঢ় হয়। একই সাথে, প্রধান ও গ্রাম নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত ক্ষুদ্র শাসক গোষ্ঠীর হাতে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এই প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করে। ঐশ্বরিক সংযোগের মাধ্যমে রাজত্বের বৈধতা অর্জন, সংগঠিত আমলাতন্ত্র গঠন এবং রাজধানীতে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ—এইসব উপাদান কার্যকরভাবে কোচ ও মেচ সম্প্রদায়ের উপজাতীয় প্রধানতন্ত্রকে একটি সংগঠিত রাজ্যে রূপান্তরিত করেছিল।
সপ্তম অধ্যায়ে তিস্তা-ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় রাষ্ট্র গঠন এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের মধ্যেকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছেন, যেখানে একটি কৌম-প্রধানতন্ত্রের সংগঠিত রাজ্যে রূপান্তর মূলত রাজনৈতিক কর্তৃত্বের বৈধতা এর প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত। বৈধতাকে শাসক ও শাসিত উভয়ের কাছে শাসন ন্যায্য বলে গৃহীত হওয়ার পরিস্থিতি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। প্রাক্-ঔপনিবেশিক উপজাতীয় রাজনীতিতে এই বৈধতা অর্জনের জন্য ইন্দো-আর্য সংস্কৃতি গ্রহণ ও প্রচার ছিল সাধারণ বৈশিষ্ট্য, যা কোচ রাজ্যের শাসক গোষ্ঠীর দ্বারাও অনুসৃত হয়েছিল এবং শাসক ও শাসিতদের মধ্যে সাংস্কৃতিক ঐক্য তৈরি করেছিল। ঐতিহাসিক ও নৃবিজ্ঞানীরা এই বৈধতা অর্জনের জন্য তিনটি প্রধান পদক্ষেপ চিহ্নিত করেছেন। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উপজাতীয় সম্প্রদায়ের কৃষিজীবীকরণ এবং গৃহীত আচার-অনুষ্ঠানের ফলস্বরূপ সাংস্কৃতিক সংশ্লেষণ শুরু হয়, যা একটি নতুন সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা সৃষ্টি করে।
এককথায় বলা যায়, অধ্যাপক বর্মণ প্রাক্-ঔপনিবেশিক ভারতে কোচ রাজ্যের উত্থান ও বিবর্তনকে (১৫৪০-১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দ) একটি বিকল্প রাষ্ট্র গঠন মডেল হিসেবে দেখেছেন। আর এখানেই তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির স্বতন্ত্রতা সুস্পষ্ট। লেখক গ্রন্থে উপস্থাপিত মূল বক্তব্যগুলিকে যৌক্তিকভাবে ও সুনিপুণভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। সবদিক থেকে বিচার করে তাই বলা যায়, এই গ্রন্থটি ভারতীয় উপমহাদেশে রাষ্ট্র নির্মাণ প্রক্রিয়া সংক্রান্ত গবেষণামূলক গ্রন্থাবলির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে সমাজবিজ্ঞান এবং ইতিহাসের পাঠক, শিক্ষার্থী ও গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হবে।