বর্তমান বিশ্বের প্রেক্ষাপটে শিশু অধিকার সুরক্ষা ও বিকাশে অঙ্গীকার

পূজা চৌধুরী, কলকাতা
চাইল্ড রাইটস” বা শিশুর অধিকার কেবল আইনি শব্দগুচ্ছ নয়, এটি প্রতিটি শিশুর বেঁচে থাকার এবং বিকাশের মৌলিক ভিত্তি। বর্তমান যুদ্ধবিগ্রহ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল ডিজিটাল বিশ্বে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত প্রতিটি শিশু যাতে শোষণমুক্ত পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারে, তা নিশ্চিত করাই আধুনিক সভ্যতার অঙ্গীকার।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে ১৯৪৬ সালে যখন ইউনিসেফ (UNICEF) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তখন লক্ষ্য ছিল যুদ্ধোত্তর ইউরোপের শিশুদের রক্ষা করা। কিন্তু ২০২৬ সালের দাঁড়িয়ে আমরা দেখছি, গাজা থেকে ইউক্রেন কিংবা সুদানের মতো সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে শিশুরা আজও সবচেয়ে বেশি বিপন্ন। ১৯৫৯ সালের ‘ডিক্লারেশন অফ দ্য রাইটস অফ দ্য চাইল্ড’-এর সেই মূলমন্ত্র—অর্থাৎ ভালোবাসা, পুষ্টি এবং নিঃখরচায় চিকিৎসার অধিকার, আজকের দিনে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। বর্তমানে শিক্ষার সংজ্ঞাও বদলেছে; এখন সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি ‘ডিজিটাল লিটারেসি’ বা সাইবার জগত থেকে শিশুদের সুরক্ষা প্রদানও শিশু অধিকারের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সাধারণ পরিষদ ইউনিসেফকে যে বিশেষ দায়িত্ব দিয়েছে, তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বর্তমানের বিভিন্ন টিকাদান কর্মসূচি এবং অপুষ্টি দূরীকরণ প্রকল্পে। ১৯৭৬ সালে আন্তর্জাতিক শিশু দিবস চিহ্নিত করার পর থেকে বিশ্বব্যাপী শিশু মৃত্যুর হার কমলেও, বর্তমান সময়ে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত শিশুদের অধিকার রক্ষা করা একটি বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গবেষক মোঁর (১৯৯৭) যেমনটি বলেছিলেন, প্রতিটি দেশকে তাদের অভ্যন্তরীণ অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে শিশুদের জন্য বিনিয়োগ করতে হবে। বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দার বাজারেও ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর উচিত শিশুদের জন্য মানসম্পন্ন জীবন নিশ্চিত করা। ইউনিসেফ এখন শুধু ওষুধ বা ভিটামিন সরবরাহেই সীমাবদ্ধ নয়, তারা বর্তমানে ডাক্তার, শিক্ষাবিদ এবং প্রযুক্তিকুশলীদের সহায়তায় শিশুদের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অনলাইন এডুকেশনের মতো আধুনিক ক্ষেত্রগুলোতেও কাজ করছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে শিশুকন্যাদের বাল্যবিবাহ রোধ এবং কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার প্রকল্পগুলো প্রশংসনীয় সাফল্য পাচ্ছে।
পরিশেষে, ইউনেস্কোর ১৯৮১ সালের রিপোর্টের সেই কথাটি আজও ধ্রুব সত্য “শিশুরাই আগামী দিনের চালিকাশক্তি।” আজকের পৃথিবীতে যে শিশুটি সংঘাত বা দারিদ্র্যের কারণে শিক্ষার সুযোগ হারাচ্ছে, তার প্রভাব পড়ছে ভবিষ্যতের বিশ্ব অর্থনীতির ওপর। তাই জাতি-ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে প্রতিটি শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশ নিশ্চিত করাই হোক আমাদের আজকের দিনের প্রধান লক্ষ্য। আজকের সুরক্ষিত শৈশবই দিতে পারে একটি স্থিতিশীল ও উন্নত বিশ্ব।