বেঙ্গালুরু, ১০ জানুয়ারি, ২০২৬: কলকাতার হসপিটালিটি সেক্টর বা আতিথেয়তা শিল্পে একটি নীরব অথচ তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বর্তমান সময়ে ভ্রমণের পরিকল্পনা আরও বেশি উদ্দেশ্য-ভিত্তিক এবং সময়ের গুরুত্ব বিবেচনা করে বানানো হচ্ছে। ফলে কলকাতায় আসা অতিথিরা এখন কেবল ঐতিহ্যবাহী বিলাসিতার বদলে হোটেলের অবস্থান, যোগাযোগ ব্যবস্থা, সুবিধা এবং বাজেটের ওপর ভিত্তি করে থাকার জায়গা নির্বাচন করছেন। কর্পোরেট ভ্রমণকারী এবং চিকিৎসার জন্য আসা ব্যক্তি থেকে শুরু করে সাধারণ পর্যটক, সকলের বুকিং প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বিশেষ অঞ্চলের প্রতি স্পষ্ট ঝোঁক দেখা যায়।
ভ্রমণ ও হোটেল বুকিং প্ল্যাটফর্মগুলো পর্যবেক্ষণ করে দেখা গিয়েছে কলকাতার সেইসব এলাকাতেই হোটেলের ( hotels in Kolkata ) চাহিদা সবচেয়ে বেশি যেখানে শহরের অন্যান্য প্রান্তের সঙ্গে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে। উন্নত পরিকাঠামো, যাতায়াতের সুব্যবস্থা এবং সাশ্রয়ী বাজেটের হোটেল ও আরামদায়ক ৩-তারকা হোটেলের সহজলভ্যতার কারণে এই এলাকাগুলো সব ধরনের ভ্রমণার্থীদের কাছেই আদর্শ হয়ে উঠেছে। এই বিশেষ এলাকাগুলোর মধ্যে কয়েকটি জায়গার নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য:
পার্ক স্ট্রিট
কলকাতার হোটেল জোনগুলোর মধ্যে পার্ক স্ট্রিট এখনও অন্যতম জনপ্রিয় এলাকা হিসেবে নিজের অবস্থান বজায় রেখেছে, বিশেষ করে অবসর যাপনের জন্য আসা পর্যটক এবং যারা প্রথমবার শহর ভ্রমণে এসেছেন তাদের কাছে এটি জনপ্রিয়। এর মূল আকর্ষণ হল শহরের কেন্দ্রস্থলে এর অবস্থান, সাংস্কৃতিক ল্যান্ডমার্ক এবং সুপ্রতিষ্ঠিত সামাজিক পরিকাঠামো। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, সেন্ট পলস ক্যাথেড্রাল এবং প্রধান শপিং ডিস্ট্রিক্টগুলোর মতো গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থানে যাওয়ার জন্য এই এলাকা থেকে চমৎকার যোগাযোগ ব্যবস্থা পাওয়া যায়।
ব্যবসা ও ভ্রমণ বিশ্লেষকদের মতে, যারা পার্ক স্ট্রিটে হোটেল বুক করেন তারা মূলত হাঁটার দূরত্বে প্রয়োজনীয় সুবিধা, মেট্রো পরিষেবা এবং শহরের মূল কেন্দ্রগুলোর কাছাকাছি থাকাকেই অগ্রাধিকার দেন। এখানে একাধিক ৩-তারকা হোটেল এবং মানসম্মত বাজেট হোটেলের ( budget hotels in Kolkata ) উপস্থিতি এই এলাকাটিকে স্বল্প সময়ের শহর ভ্রমণ, সপ্তাহান্তের পর্যটক এবং পেশাগত কাজে আসা ব্যক্তিদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য পছন্দে পরিণত করেছে।
সল্টলেক
সল্টলেক, বিশেষ করে সেক্টর ফাইভ (Sector V), বর্তমানে কলকাতার অন্যতম সক্রিয় হোটেল বুকিং জোনে পরিণত হয়েছে। এর প্রধান কারণ হল এখানে থাকা আইটি পার্ক, কর্পোরেট অফিস এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থান। মিটিং, স্বল্পমেয়াদী অ্যাসাইনমেন্ট এবং কর্পোরেট ইভেন্টের জন্য আসা পেশাদারদের কারণে এই অঞ্চলে সারা বছরই হোটেলের চাহিদা ভালোই থাকে।
এই এলাকার হোটেলের চাহিদা মূলত বিজনেস ট্রাভেলের একটি বৃহত্তর প্রবণতাকে প্রতিফলিত করে। যা হল প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে কার্যকরী এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পন্ন আবাসনকে প্রধান্য দেওয়া। কলকাতায় ৩০০০ টাকার নিচের হোটেলের ( Hotels under 3000 in Kolkata ) বুকিং সংখ্যা এখানে সবচেয়ে বেশি। যারা বিলাসিতার চেয়ে দক্ষতা, অবস্থান এবং স্বাচ্ছন্দ্যকে বেশি গুরুত্ব দেন, মূলত সেই ভ্রমণকারীদের চাহিদা এখানে পূরণ করা হয়। উন্নত সড়ক যোগাযোগ এবং বিমানবন্দর থেকে তুলনামূলক দ্রুত যাতায়াতের সুবিধার কারণে, সল্টলেক কলকাতার বিজনেস ট্রাভেল বা ব্যবসায়িক ভ্রমণের আবাসন কাঠামোর ওপর ক্রমাগত প্রভাব বিস্তার করে চলেছে।
নিউ টাউন (রাজারহাট)
রাজারহাটের নিউ টাউন হল কলকাতার পরিকল্পিত নগর সম্প্রসারণের একটি প্রতিচ্ছবি এবং এটি দ্রুত একটি উচ্চ-চাহিদা সম্পন্ন আবাসন অঞ্চল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। বিমানবন্দর, বাণিজ্যিক কেন্দ্র, হাসপাতাল এবং কনভেনশন ভেন্যুগুলো কাছাকাছি থাকায় বিভিন্ন ধরনের ভ্রমণার্থীদের আকৃষ্ট করেছে।
হসপিটালিটি সেক্টরের তথ্য অনুযায়ী, সুশৃঙ্খল বিন্যাস এবং নতুন ঘরানার হোটেল বা প্রপার্টির কারণে পরিবার বা চিকিৎসার জন্য আসা ব্যক্তি এবং ব্যবসায়িক প্রতিনিধিরা বর্তমানে এই এলাকাটিকে বেশি পছন্দ করছেন। নিউ টাউনে বাড়তে থাকা হোটেলের সংখ্যা, বিশেষ করে বাজেটের হোটেল এবং মাঝারি মানের ৩-তারকা হোটেলগুলো এই অঞ্চলটিকে একটি নির্ভরযোগ্য গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে চলেছে। এই পরিবর্তনটি স্পষ্ট করে দেয় যে, কীভাবে পরিকাঠামোর উন্নয়ন মেট্রোপলিটন শহরগুলোতে হোটেল বুকিংয়ের বিষয়টির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
এসপ্ল্যানেড ও সেন্ট্রাল কলকাতা
ধর্মতলাসহ মধ্য কলকাতার আশেপাশের এলাকাগুলোতে হোটেলের প্রবল চাহিদা রয়েছে, যার মূল কারণ হল এখানে মানুষের ব্যাপক আনাগোনা এবং যাতায়াতের সুব্যবস্থা। যারা পরিবহণ হাব (বাস বা ট্রেন টার্মিনাস), বাজার এবং প্রাতিষ্ঠানিক এলাকাগুলোর কাছাকাছি থাকাকে অগ্রাধিকার দেন, তাদের কাছে এই অঞ্চলটি অত্যন্ত আকর্ষণীয়। কলকাতায় ৩০০০ টাকার নিচে হোটেলের খোঁজার জন্য এটি একটি দুর্দান্ত জায়গা, যা ব্যবসায়ী, একক ভ্রমণার্থী, ছাত্রছাত্রী এবং স্বল্প সময়ের জন্য আসা দর্শকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। যদিও এই এলাকাটি বেশ জনবহুল এবং ব্যস্ত, তবুও এর অতুলনীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা এখানে বাজেট হোটেলগুলোর ধারাবাহিক চাহিদা নিশ্চিত করে।
এই বুকিং প্যাটার্ন বা প্রবণতা কী নির্দেশ করে
এই চারটি অঞ্চলের জনপ্রিয়তা প্রমাণ করে যে, বর্তমানে ভ্রমণকারীরা আবাসন নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করেছেন। এখন বুকিংয়ের সিদ্ধান্তগুলো কেবল ‘স্টার রেটিং’-এর ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং ভ্রমণের উদ্দেশ্য, অবস্থানের প্রাসঙ্গিকতা এবং সাশ্রয়ী মূল্যের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হচ্ছে। স্বল্প সময়ের অবস্থান, ব্যবসায়িক ভ্রমণ এবং ফ্লেক্সিবল ভ্রমণসূচী বর্তমানে আরও স্মার্ট ও শহর-কেন্দ্রিক হোটেলের চাহিদা তৈরি করছে। কিউরেটেড হসপিটালিটি প্ল্যাটফর্ম এবং এগ্রিগেটররা এই পরিবর্তনশীল চাহিদার সঙ্গে হোটেলের জোগান সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, এতে ভ্রমণার্থীরা সঠিক অবস্থানে সহজেই সঠিক আবাসন খুঁজে পাচ্ছেন।
কলকাতার হসপিটালিটি সেক্টরের আগামীর পথ
ভ্রমণার্থীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকায়, কলকাতার হোটেলগুলোর চাহিদা মূলত সেইসব এলাকাতেই কেন্দ্রীভূত থাকছে যেখানে যাতায়াতের সুবিধা এবং সঠিক ভ্যালু পাওয়া যাচ্ছে। বাজেট হোটেলগুলোর প্রতি এই দীর্ঘস্থায়ী আকর্ষণ একটি পরিপক্ক বা ম্যাচিওর বাজারকে প্রতিফলিত করে, যা বিলাসিতার চেয়ে দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতার ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়। এই বুকিং ট্রেন্ডগুলো বিভিন্ন ধরনের ভ্রমণকারীদের পরিষেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে কলকাতার প্রস্তুতিকে তুলে ধরে এবং শহরটিকে একটি ফ্লেক্সিবল, ব্যবসা-বান্ধব ও ভ্রমণকারী-কেন্দ্রিক গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
