মহিলারা তাদের মাইগ্রেন নিয়ন্ত্রণে রাখতে ৭টি উপায় অবলম্বন করতে পারেন

আপনি কি জানেন যে, পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের মাইগ্রেনে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা তিনগুণ বেশি? এর মধ্যে প্রায় ৩০% মাইগ্রেনের মূল কারণ হলো হরমোনের পরিবর্তন, বিশেষ করে ঋতুচক্র বা পিরিয়ডের সময়ে। অনেক মহিলার কাছে মাইগ্রেন কেবল মাঝেমধ্যে হওয়া কোনো অস্বস্তি নয়; এটি একটি অসহ্য মাথাব্যথা যা তাদের পুরোপুরি অসহায় করে তোলে। হরমোনের পরিবর্তন থেকে শুরু করে কাজ, পরিবার এবং ব্যক্তিগত জীবনের ধকল সামলানো—সব মিলিয়ে মাইগ্রেনের এই বোঝা বইতে অনেকেরই হিমশিম খেতে হয়। তা সত্ত্বেও, লক্ষ লক্ষ মহিলা নীরবে এই দৈনন্দিন চ্যালেঞ্জের সাথে লড়াই করে যাচ্ছেন।

কলকাতার ন্যাশনাল নিউরোসায়েন্সেস সেন্টারের মেডিকেল ডিরেক্টর এবং চিফ কনসালট্যান্ট নিউরোলজিস্ট ডাঃ তাপস কুমার ব্যানার্জী বলেন, “যদিও মহিলাদের হরমোন মাইগ্রেনে বড় ভূমিকা পালন করে, তবে এটিই একমাত্র কারণ নয়। কর্মজীবনের চাপের কারণে মানসিক অস্থিরতা, ঠিকমতো খাবার না খাওয়া বা দেরি করে খাওয়া, এমনকি ধর্মীয় উপবাসের মতো জীবনযাত্রার নানা বিষয়ও মাইগ্রেনের সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই এই কারণগুলো শনাক্ত করা মাইগ্রেন নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং কাজের ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। জীবনযাত্রায় সামান্য পরিবর্তন এবং চিকিৎসার আধুনিক পদ্ধতির সমন্বয়ে এই অবস্থার অনেক উন্নতি সম্ভব। মাইগ্রেনের সমস্যাকে ব্যক্তিগত ও চিকিৎসা—উভয় দিক থেকেই মোকাবিলা করলে একজন রোগী তার মাথাব্যথা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন এবং স্বাভাবিক জীবন ফিরে পেতে পারেন।”

মাইগ্রেন নিয়ন্ত্রণে রাখার কিছু উপায় এখানে দেওয়া হলো:

হরমোনের প্রভাব বোঝা: মহিলাদের মাইগ্রেনের অন্যতম প্রধান কারণ হরমোনের পরিবর্তন। একে “মেনস্ট্রুয়াল মাইগ্রেন” বা “মাসিককালীন মাইগ্রেন” বলা হয়, যা পিরিয়ডের ঠিক আগে বা পিরিয়ড চলাকালীন এস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা হঠাৎ কমে যাওয়ার ফলে ঘটে। এছাড়া গর্ভাবস্থা, মেনোপজ বা গর্ভনিরোধক বড়ি ব্যবহারের কারণেও এমনটা হতে পারে। এটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শরীরকে স্থিতিশীল রাখার অভ্যাস করুন, যেমন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো, সুষম খাবার খাওয়া, নিয়মিত ব্যায়াম করা, পর্যাপ্ত জল পান করা এবং মানসিক চাপ কমানোর চর্চা করা।

মানসিক চাপকে বাড়তে দেবেন না: মহিলাদের প্রায়ই পেশাদার জীবন, সংসার এবং যত্নশীলের ভূমিকা পালন করতে হয়, এর ফলে বাড়ি এবং/অথবা কাজের স্থানে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ তৈরি হয়। যা স্নায়ুতন্ত্রকে অতিরিক্ত উত্তেজিত করে তোলে, এর ফলে অ্যাড্রেনালিন এবং কর্টিসলের মতো স্ট্রেস হরমোন নিঃসরণ বেড়ে যায়, যা মাইগ্রেনকে উসকে দেয়। মানসিক চাপ কমাতে ধ্যান, যোগব্যায়াম বা তাই-চি অনুশীলন করতে পারেন। এছাড়া একটি ‘মাইগ্রেন ডায়েরি’ রাখুন যেখানে মাথাব্যথার সময়, সম্ভাব্য কারণ (যেমন  চাপ সৃষ্টিকারী ঘটনা, কোন খাবার খেয়েছেন বা ঘুমের ধরন) এবং কোন চিকিৎসা কাজ দিচ্ছে তা লিখে রাখুন।

রুটিনের ধারাবাহিকতাকে ধারাবাহিকতাকে অগ্রাধিকার দিন: অনিয়মিত ঘুম, অপর্যাপ্ত জল পান বা খাবার বাদ দিলে শরীরের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং মাইগ্রেনের আক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুম থেকে ওঠার চেষ্টা করুন। শোবার আগে মোবাইল বা ল্যাপটপের স্ক্রিন এড়িয়ে চলুন; তার বদলে বই পড়া বা হালকা গান শোনার অভ্যাস করুন। সাথে সবসময় জলের বোতল রাখুন এবং নিয়মিত জল পান করার জন্য প্রয়োজনে অ্যালার্ম দিয়ে রাখতে পারেন।

ক্যাফেইন গ্রহণের দিকে নজর দিন: মাইগ্রেনের ক্ষেত্রে ক্যাফেইন বা কফি অনেকটা দোধারী তলোয়ারের মতো কাজ করে। কারও কারও ক্ষেত্রে এটি ব্যথা কমাতে সাহায্য করে, আবার কারও জন্য এটিই মাথাব্যথার মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আপনার শরীর ক্যাফেইনে কেমন প্রতিক্রিয়া দেখায় তা খেয়াল করুন। বিশেষ করে বিকেল বা সন্ধ্যার পর বেশি কফি খাবেন না, কারণ এটি আপনার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। কফির বিকল্প হিসেবে হারবাল চা যেমন পারমিন্ট বা ক্যামোমাইল চা পান করতে পারেন।

মাইগ্রেন উপশমের জন্য পুষ্টি উন্নত করুন: মাইগ্রেন নিয়ন্ত্রণে খাবার খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রক্রিয়াজাত মাংস, পুরনো পনির/চিজ এবং কৃত্রিম মিষ্টি কিছু মহিলার মাথাব্যথা বাড়িয়ে দিতে পারে, নির্দিষ্ট সময়ে খাবার না খাওয়ার বা খাবার বাদ দেওয়ার অভ্যাসও ক্ষতিকর। তাই প্রতি ৩-৪ ঘণ্টা অন্তর হালকা ও সুষম খাবার খাওয়ার চেষ্টা করুন। খাদ্যতালিকায় টাটকা ফলমূল, সবজি এবং লীন প্রোটিন রাখুন। খিদে পেলে খাওয়ার জন্য সাথে বাদাম বা শুকনো ফল রাখতে পারেন। একটি ফুড ডায়েরি এমন খাবারগুলো ট্র্যাক করতে সাহায্য করতে পারে যা সমস্যার কারণ হতে পারে।