আমাদের দেশের সংবিধান কেবল একটি আইনি পাঠ্য নয়, এটি একটি পথপ্রদর্শক, যা দেশের প্রতিটি নাগরিকের ন্যায্য সমতা এবং স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। আমাদের প্রথম এবং প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে জনগণের প্রতি কর্তব্য পালন করা। বুধবার আগরতলার প্রজ্ঞা ভবনে সমস্ত অংশের মানুষের প্রতি জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা- শীর্ষক সেমিনার ও কর্মশালার উদ্বোধন করে রাজ্যপাল ইন্দ্রসেনা রেড্ডি নান্নু একথা বলেন। রাজ্যপাল বলেন, আজকের কর্মশালার বিষয় সকল শ্রেণির জনগণের প্রতি জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা কেবল আলোচনার বিষয় নয়, এটি কার্যকর গণতন্ত্রের একটি ভিত্তি। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে সংবিধানের উল্লেখিত ন্যায় অধিকার প্রতিটি নাগরিককে প্রদান করা। তিনি জনপ্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে বলেন, দায়িত্ববোধ বলতে বোঝায় যে আপনি একটি নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকা থেকে নির্বাচিত হলেও আপনার কর্তব্য সমগ্র রাজ্য এবং জনগণের জন্য সমর্পিত। পাশাপাশি উন্নয়নের সুফল সমাজের অন্তিম ব্যক্তির নিকট পৌঁছানো নিশ্চিত করাও জনপ্রতিনিধিদের গুরুদায়িত্ব। অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর ডা. মানিক সাহা বলেন, জনগণের সম্মান রক্ষা, ব্যক্তিগত আচরণে শালীনতা বজায় রাখা, সমস্যায় মানুষের পাশে থাকা এবং কাজের প্রতি পূর্ণ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই একজন জনপ্রতিনিধির প্রকৃত পরিচয়। জবাবদিহিতাই গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি। গণতন্ত্রকে আরও স্বচ্ছ, শক্তিশালী ও জনমুখী করে তোলার লক্ষ্যে আজকের এই উদ্যোগ এক ঐতিহাসিক মাইলফলক। জনগণের আস্থা অর্জন করা এবং সেই আস্থার মর্যাদা রক্ষা করাই একজন জনপ্রতিনিধির সর্বোচ্চ অঙ্গীকার। নৈতিকতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ভিত মজবুত হলেই গণতন্ত্র বিকশিত হয়। তিনি বলেন, ভারত বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দূরদর্শী নেতৃত্বে আজ বিশ্বমঞ্চে ভারতের মর্যাদা ও গৌরব বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই গৌরব রক্ষা ও একে আরও সুদৃঢ় করা প্রত্যেক জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব। তিনি উল্লেখ করেন, ভারতের সংবিধান আমাদের স্বাধীনতা ও অধিকার প্রদান করেছে। সংবিধানের এই মর্যাদা ও চেতনাকে সুরক্ষিত রাখা আমাদের নৈতিক কর্তব্য।
জনপ্রতিনিধিদের কাজ শুধুমাত্র নির্বাচনের সময় মানুষের কাছে যাওয়া নয়। সারা বছর মানুষের পাশে থাকা, তাঁদের সমস্যা শোনা ও দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়াই প্রকৃত জনসেবা। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, জনগণ সব দেখে, সব বোঝে। তাই শুধু ভোটে জয়লাভের লক্ষ্য নয় সমাজের প্রান্তিকস্তরের উন্নয়ন, দূর্বল অংশের মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করাই জনপ্রতিনিধির প্রকৃত সার্থকতা। আজকের এই সেমিনারের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও জনমুখী করে তুলতে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে রাজ্যসভার ডেপুটি চেয়ারম্যান হরিবল্স নারায়ণ সিং বলেন, সিপি.এ. ১৯১১ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা যা সংসদীয় গণতন্ত্র, সুশাসন এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় কাজ করে। এর মূল কাজ হলো জনপ্রতিনিধিদের দক্ষতা বৃদ্ধি, স্বচ্ছ শাসনব্যবস্থা পরিচালনার মাধ্যমে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে তোলা। সি.পি.এ.-র অন্যতম উদ্দেশ্য আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। সেই অর্থে আজকের এই আয়োজন খুবই প্রাসঙ্গিক। জনগণের প্রকৃত উন্নতি তথা জীবনশৈলীর উন্নতির স্বার্থে এই উদ্যোগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, ত্রিপুরায় ১৯টি জনজাতি সম্প্রদায়ের মেলবন্ধনে একটি মিশ্র সমৃদ্ধ সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছে। প্রাকৃতিক সম্পদ, ঐতিহ্যবাহী সভ্যতা এবং সমাজের প্রান্তিকস্তরের উন্নতিসাধন ইত্যাদি সব মিলিয়ে ত্রিপুরা দেশের মধ্যে বর্তমানে এক আলোচিত অধ্যায়। ২০১৪ সালে কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে সরকার গঠন হওয়ার পর উত্তর-পূর্বাঞ্চল সহ ত্রিপুরার উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিরাট গতিশীলতা এসেছে। কেন্দ্রের অ্যাক্ট ইস্ট পলিসি থেকে শুরু করে উত্তর পূর্বাঞ্চলের ৮টি রাজ্যকে অষ্টলক্ষ্মী রূপে তুলে ধরার ইতিবাচক প্রয়াস সাধারণ মানুষ আজ প্রতিটি ক্ষেত্রে উপলব্ধি করতে পারছেন। ডেপুটি চেয়ারম্যান তার বক্তব্যে ত্রিপুরার রাজবংশের ইতিহাস তথা মানিক্য রাজবংশের গৌরবময় অধ্যায়ের উপরও আলোকপাত করেন। তিনি জনপ্রতিনিধিদের প্রতি আহ্বান রাখেন সমাজের সকল অংশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে রাজ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার।
অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি বক্তব্য রাখতে গিয়ে পশ্চিম ত্রিপুরা লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ বিপ্লব কুমার দেব বলেন, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার কাজে জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ববোধ ও জবাবদিহিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনপ্রতিনিধিদের উচিত মানুষের আস্থা অর্জন করা। কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের কার্যপ্রণালির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংসদীয় গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে এই সংস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বনমন্ত্রী অনিমেষ দেববর্মা বলেন, জনগণের কল্যাণে বিভিন্ন জনকল্যাণমুখী প্রকল্প সবাই মিলে রূপায়ণ করা উচিত। তবেই প্রকৃত অর্থে জনগণের উপকার হয়। সংসদীয় গণতন্ত্রে জনপ্রতিনিধিদের খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে সাংসদ কৃতী দেবী সিং দেববর্মা বলেন, জনগণের বিশ্বাস অর্জন করা একজন জনপ্রতিনিধির সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। জনপ্রতিনিধিদের সঠিক দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়ে উঠে। আসাম থেকে নির্বাচিত সাংসদ পরিমল শুরু বৈদ্য বলেন, এক ভারত শ্রেষ্ঠ ভারত রূপায়ণের কাজে জনপ্রতিনিধিদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। রাজ্য বিধানসভার মুখ্যসচেতক কল্যাণী সাহা রায় বলেন, ত্রিপুরার জন্য আজ খুবই গর্বের দিন। তিনি জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহিতার সঙ্গে মানুষের অধিকার রক্ষায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। এতেই গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন। কংগ্রেস দলের বিধায়ক গোপাল চন্দ্র রায় বলেন, আজকের এই উদ্যোগ বর্তমান সময়ে খুবই প্রাসঙ্গিক। গণতন্ত্র রক্ষায় বিরোধী দলের বিধায়কদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অনুষ্ঠানে বিরোধী দলনেতা জিতেন্দ্র চৌধুরীর বার্তা বক্তব্য করে শোনান বিধায়ক সুদীপ সরকার। অনুষ্ঠানে ধন্যবাদসূচক বক্তব্য রাখেন বিধানসভার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রামপ্রসাদ পাল। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন রাজ্যসভার সাংসদ রাজীব ভট্টাচার্য্য, কৃষিমন্ত্রী রতনলাল নাথ, পুরনিগমের মেয়র তথা বিধায়ক দীপক মজুমদার। আজকের অনুষ্ঠানে মন্ত্রিসভার সদস্যগণ ছাড়াও বিভিন্ন জিলা পরিষদের সভাধিপতি, টি.টি.এ.এ.ডি.সি.-র সিইএম, টি.টি.এ.এ.ডি.সি.-র সদস্য-সদস্যা, পুরনিগমের কর্পোরেটরগণ সহ পঞ্চায়েত এবং ব্লকস্তরের জনপ্রতিধিনিধিগণ উপস্থিত ছিলেন।
