টাটা গ্রুপে বড় রদবদল: চন্দ্রশেখরণের পুনর্নিয়োগ নিয়ে নোয়েল টাটার কড়া অবস্থান

ভারতের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী টাটা সন্সের শীর্ষ নেতৃত্বে এন চন্দ্রশেখরণের মেয়াদ বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে এক নতুন নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। টাটা ট্রাস্টের বর্তমান চেয়ারম্যান নোয়েল টাটা, চন্দ্রশেখরণের পুনর্নিয়োগের ক্ষেত্রে বেশ কিছু কঠোর শর্তারোপ করেছেন, যা টাটা গ্রুপের অভ্যন্তরীণ কর্পোরেট রাজনীতিতে এক বড়সড় রদবদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ চন্দ্রশেখরণের বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও, তাঁর মেয়াদ আরও পাঁচ বছর বাড়ানোর প্রস্তাবটি এখন নোয়েল টাটার তীক্ষ্ণ নজরদারির মুখে পড়েছে। রতন টাটার প্রয়াণের পর নোয়েল টাটা যখন টাটা ট্রাস্টের হাল ধরেন, তখন থেকেই ধারণা করা হচ্ছিল যে ট্রাস্ট এবং টাটা সন্সের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় নতুন কোনো সমীকরণ তৈরি হতে পারে। বর্তমানে নোয়েল টাটার এই ‘কড়া অবস্থান’ সেই ধারণাকেই বাস্তবে রূপ দিচ্ছে বলে মনে করছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা।

নোয়েল টাটার প্রধান শর্তগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো টাটা সন্সের বোর্ড এবং টাটা ট্রাস্টের মধ্যে আরও স্বচ্ছ ও সরাসরি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। তিনি প্রস্তাব করেছেন যে, গ্রুপের ভবিষ্যৎ কৌশলগত সিদ্ধান্ত এবং বড় ধরনের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ট্রাস্টের মনোনীত ব্যক্তিদের মতামতকে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে এয়ার ইন্ডিয়ার পুনর্গঠন এবং টাটা ইলেকট্রনিক্সের মতো উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ সেমিকন্ডাক্টর প্রকল্পগুলোতে যেভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে, তা নিয়ে নোয়েল টাটা কিছুটা সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তিনি চান যে এই বিশাল বিনিয়োগগুলো যেন গ্রুপের দীর্ঘমেয়াদী লভ্যাংশ বা ডিভিডেন্ড প্রদানের সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে। চন্দ্রশেখরণের নেতৃত্বে টাটা গ্রুপ গত কয়েক বছরে ডিজিটাল এবং এভিয়েশন খাতে যে অভাবনীয় বিস্তার ঘটিয়েছে, তার প্রশংসা থাকলেও নোয়েল টাটা এখন ‘ব্যালেন্স শিট’ আরও শক্তিশালী করার ওপর জোর দিচ্ছেন।

এই রদবদলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো টাটা সন্সের বোর্ডে ট্রাস্টের প্রভাব পুনপ্রতিষ্ঠা করা। রতন টাটার সময়ে চন্দ্রশেখরণ অনেকটা স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পেতেন, কিন্তু নোয়েল টাটা মনে করেন যে টাটা ট্রাস্টের যেহেতু ৬৬ শতাংশ অংশীদারিত্ব রয়েছে, তাই নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে তাদের ভূমিকা আরও সক্রিয় হওয়া উচিত। গুঞ্জন রয়েছে যে, চন্দ্রশেখরণের মেয়াদ বাড়ানোর বিনিময়ে নোয়েল টাটা ট্রাস্টের পক্ষ থেকে আরও দুইজন প্রতিনিধিকে টাটা সন্সের বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি তুলেছেন। এর ফলে চন্দ্রশেখরণের একচ্ছত্র ক্ষমতা কিছুটা হ্রাস পেতে পারে এবং প্রতিটি বড় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তাঁকে আরও বেশি আলোচনার টেবিলে বসতে হবে। এই নতুন শর্তাবলি চন্দ্রশেখরণ কীভাবে গ্রহণ করবেন, তার ওপরই নির্ভর করছে টাটা গ্রুপের আগামী পাঁচ বছরের গতিপথ।

সবশেষে, টাটা গ্রুপের এই অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও কিছুটা কৌতূহলের সৃষ্টি করেছে। তবে টাটা সন্সের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে যে, নোয়েল টাটা এবং চন্দ্রশেখরণের মধ্যে ব্যক্তিগত কোনো বিরোধ নেই; বরং এটি গ্রুপের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে আরও মজবুত করার একটি প্রক্রিয়া মাত্র। টাটা পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে নোয়েল টাটা চান গ্রুপের মূল্যবোধ ও আর্থিক শৃঙ্খলা যেন কঠোরভাবে বজায় থাকে। অন্যদিকে, চন্দ্রশেখরণ গত কয়েক বছরে টাটা গ্রুপকে একটি আধুনিক ও প্রযুক্তি-নির্ভর গ্লোবাল ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এই দুই চিন্তাধারার মধ্যে যদি একটি সঠিক সমন্বয় ঘটে, তবে টাটা গ্রুপ আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে। তবে আপাতত সবার নজর টাটা সন্সের পরবর্তী বোর্ড মিটিংয়ের দিকে, যেখানে চন্দ্রশেখরণের ভবিষ্যৎ এবং নোয়েল টাটার শর্তগুলোর চূড়ান্ত ফয়সালা হবে।