গঙ্গা ও বঙ্গোপসাগরের মিলনস্থল গঙ্গাসাগর। মকর সংক্রান্তির পুণ্যলগ্নে এই তীর্থভূমি পরিণত হয়েছে আধ্যাত্মিকতার মহাসমুদ্রে। লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থীর ভিড়ের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে নাগা সন্ন্যাসীদের কর্মকাণ্ড ও জীবনযাপন। ছাই মাখা দেহ, জটাধারী কেশ, হাতে ত্রিশূল কিংবা ডমরু – নাগা সন্ন্যাসীদের এক ঝলক দেখতেই ভিড় জমাচ্ছেন তীর্থযাত্রীরা। হিমেল ঠান্ডা আর কনকনে হাওয়া উপেক্ষা করে নিরাবরণ শরীরে নির্বিকারভাবে ঘোরাফেরা করছেন তাঁরা। নাগা সন্ন্যাসীদের মতে, শরীর নয় আত্মাই আসল আর লজ্জা ও ভয় সবই মায়া। শৈব সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত নাগা সন্ন্যাসীরা সংসার, পরিবার ও সামাজিক বন্ধন ত্যাগ করে আত্মসাধনায় ব্রতী হন।
দীক্ষার সময় প্রতীকীভাবে নিজের ‘মৃত্যু’ ঘটিয়ে তাঁরা শুরু করেন নতুন এক জীবন। দিনের পর দিন উপবাস, আগুনের সামনে ধ্যান, কখনও এক পায়ে দাঁড়িয়ে তপস্যা এই কঠোর সাধনাই তাঁদের নিত্যদিনের সঙ্গী। নাগা সন্ন্যাসীদের কাছে গঙ্গাসাগর শুধুই তীর্থস্থান নয়, শক্তি সঞ্চয়ের এক পবিত্র কেন্দ্র। বিশ্বাস করা হয়, গঙ্গাসাগরের পুণ্যস্নান তাঁদের তপস্যাকে পূর্ণতা দেয়। অনেক পুণ্যার্থীর বিশ্বাস, নাগা বাবাদের দর্শন না করলে গঙ্গাসাগর যাত্রা অসম্পূর্ণ থেকে যায় – তাঁদের চোখে তাঁরা যেন জীবন্ত দেবতা। লক্ষ লক্ষ মানুষের ভিড় সামলাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নাগা সন্ন্যাসীদের জন্য রয়েছে আলাদা আখড়া ও বিশেষ নিরাপত্তা বলয়। তবে আখড়ার আশপাশে নানা দৃশ্যও নজরে আসছে – কেউ বস্ত্রবিহীন শরীরে তীর্থযাত্রীদের কাছে দানের আশায়, কেউ আবার হুংকার ছেড়ে উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন।
নাগা সন্ন্যাসীদের এক ঝলক দেখতে মানুষের উৎসাহ চোখে পড়ার মতো। আধুনিকতার দুনিয়ায় দাঁড়িয়েও নাগা সন্ন্যাসীরা যেন প্রাচীন ভারতের জীবন্ত ইতিহাস। গঙ্গাসাগরের পুণ্যভূমিতে তাঁদের উপস্থিতি আজও মানুষের মনে জাগিয়ে তোলে ত্যাগ, তপস্যা আর আত্মসন্ধানের গভীর প্রশ্ন। গঙ্গাসাগরের পুণ্যস্নান যেমন আত্মশুদ্ধির প্রতীক, তেমনই নাগা সন্ন্যাসীরা ত্যাগের চরম নিদর্শন। এবারের গঙ্গাসাগরে নাগা সন্ন্যাসীদের বাহারি নামও তীর্থযাত্রীদের মনে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে – নম্বর বাবা, ডিজে বাবা, লাইটিং বাবা সহ আরও কত কী। নামের বৈচিত্র্যের মতোই তাঁদের জীবন ও দর্শন ঘিরে কৌতূহল, বিস্ময় আর ভক্তিতে ভরে উঠেছে গঙ্গাসাগরের তট।
