পূজা চৌধুরি, দমদম
বর্তমান আধুনিক সভ্যতায় দাঁড়িয়ে শিক্ষার সংজ্ঞা ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে গভীর ভাবনার অবকাশ রয়েছে। আজ শিক্ষা কেবল ডিগ্রি বা একটি ভালো চাকরির মাপকাঠিতে পর্যবসিত হয়েছে। কিন্তু শিক্ষার আসল সার্থকতা কেবল বৈষয়িক উন্নতিতে নয়, বরং একজন মানুষকে পূর্ণাঙ্গ এবং আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার মধ্যে নিহিত। ইউনেস্কোর ডেলরস কমিশনের প্রস্তাবিত শিক্ষার চারটি মূল স্তম্ভকে পাথেয় করে জীবন গড়ার এই পথটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। নিচে এই চারটি স্তম্ভ এবং আপনার উল্লিখিত বিশেষ দিকগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
জানার জন্য শিক্ষা
শিক্ষার এই প্রথম স্তম্ভটি কেবল পাঠ্যবইয়ের তথ্য মুখস্থ করার বিষয় নয়। এটি মূলত শেখার কৌশল আয়ত্ত করা। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে প্রতিদিন তথ্যের পাহাড় জমছে, কিন্তু সেই তথ্যকে জ্ঞানে রূপান্তর করার জন্য প্রয়োজন একাগ্রতা ও বিচারবোধ। এর মধ্যে প্রধান বিষয়গুলো হলো, কোনও বিষয়কে অন্ধভাবে গ্রহণ না করে তার কার্যকারণ সম্পর্ক বোঝার চেষ্টা করা। এটি শিক্ষার্থীর মনের জানলা খুলে দেয়।
শিক্ষার্থী যাতে যেকোনও বিষয়ে নিবিড়ভাবে মনোনিবেশ করতে পারে এবং অর্জিত জ্ঞানকে দীর্ঘকাল ধরে রাখতে পারে, সেই চর্চা করা। বিদ্যালয় বা কলেজের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ হওয়ার পরও যেন একজন মানুষ প্রতিনিয়ত নিজেকে সমৃদ্ধ করার আগ্রহ হারিয়ে না ফেলে। জ্ঞানের জগৎ অসীম, তাই শেখার শেষ নেই।
কর্মের জন্য শিক্ষা
তাত্ত্বিক জ্ঞানকে যখন বাস্তব জীবনের কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়, তখনই শিক্ষা সার্থকতা পায়। এই স্তম্ভটি কর্মসংস্থানের পাশাপাশি দক্ষতা বৃদ্ধিতে জোর দেয়। এই শিক্ষা আমাদের শেখায় যে শুধু বই পড়ে বা চিন্তা করে নয়, বরং হাতের কাজ ও বুদ্ধির সঠিক সমন্বয়ে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো শরীর ও মনকে সুস্থ রাখা এবং কায়িক পরিশ্রম বা মেহনতি মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা জাগিয়ে তোলা। যখন আমরা কারিগরি বা বৃত্তিমূলক কাজ শিখি, তখন আমরা স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি একটি কর্মঠ সমাজ গড়তে সাহায্য করি। এছাড়া এটি মানুষকে কেবল যন্ত্রের মতো কাজ করতে বারণ করে; বরং বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে সৃজনশীলভাবে সমস্যার সমাধান করা যায় এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করা যায়, সেই বৌদ্ধিক বিকাশ ঘটায়। সমাজবদ্ধ জীব হিসেবে অন্যদের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করা বা টিমওয়ার্কের মাধ্যমে বড় লক্ষ্য অর্জন করাও এই শিক্ষার অংশ। সবশেষে, এটি আমাদের শেখায় যে কাজ যেন শুধু দায়সারা না হয়, বরং তার মধ্যে যেন শিল্প ও সৌন্দর্যের ছোঁয়া থাকে। অর্থাৎ, দক্ষতা, বুদ্ধি, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং সৃজনশীলতার মিশেলে একজন আদর্শ মানুষ গড়ে তোলাই এর মূল উদ্দেশ্য।
একত্রে বসবাসের জন্য শিক্ষা
বর্তমান অস্থির পৃথিবীতে সামাজিক সম্প্রীতি ও সহিষ্ণুতার বড়ই অভাব। এই শিক্ষা আমাদের শেখায় কীভাবে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য খুঁজে পেতে হয়। অন্যের সংস্কৃতি, ধর্ম এবং ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং যেকোনও বিরোধের ক্ষেত্রে হিংসার পথ পরিহার করে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজে বের করা এই শিক্ষার মূল মন্ত্র। সহমর্মিতা ও সহযোগিতার মনোভাবই একটি শান্তিপূর্ণ পৃথিবী গড়ে তুলতে পারে।
মানুষ হওয়ার জন্য শিক্ষা
এটিই শিক্ষার চূড়ান্ত ও শ্রেষ্ঠ লক্ষ্য। মানুষ হওয়ার শিক্ষা মানে নিজের ব্যক্তিত্বের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটানো। এটি ব্যক্তির চিন্তার স্বাধীনতা, কল্পনাশক্তি এবং নৈতিক চরিত্রের উন্নয়ন ঘটায়। নিজের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখা এবং সমাজের প্রতি নিজের কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হওয়াই এই স্তরের সার্থকতা। একজন প্রকৃত শিক্ষিত মানুষ কেবল নিজের ভালো চায় না, বরং সর্বজনীন কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করে।
পরিশেষে বলা যায়, প্রকৃত শিক্ষা কেবল অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রার নাম নয়, বরং এটি মানুষের অন্তরনিহিত শক্তিকে বিকশিত করার একটি নিরন্তর প্রক্রিয়া। যখন একজন মানুষ শারীরিক সামর্থ্য, বৌদ্ধিক তীক্ষ্ণতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং নান্দনিক চেতনার সমন্বয় ঘটিয়ে দক্ষ হয়ে ওঠে, তখনই শিক্ষার প্রথম সার্থকতা প্রমাণিত হয়। তবে কেবল দক্ষতা অর্জনই শেষ কথা নয়; বরং অন্যের সঙ্গে মিলেমিশে থাকার মানসিকতা এবং নিজের ভেতরের মনুষ্যত্বকে জাগিয়ে তোলাই হলো শিক্ষার চূড়ান্ত শিখর। আমাদের আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় ইউনেস্কো নির্ধারিত এই চারটি স্তম্ভের সঠিক প্রতিফলন ঘটাতে পারলেই আমরা কেবল ডিগ্রিধারী জনবল নয়, বরং একটি সহমর্মী, রুচিবান এবং আদর্শ সমাজ উপহার দিতে পারব। মনে রাখতে হবে, যে শিক্ষা মানুষকে মানুষ হিসেবে চিনতে শেখায় না, তা কেবল যান্ত্রিক জ্ঞান; আর যে শিক্ষা বিবেককে জাগ্রত করে, সেটিই হলো প্রকৃত মুক্তি।
