নতুন দৃষ্টিতে ভারতছাড়ো আন্দোলনের বিভিন্ন প্রসঙ্গ

রিভিজিটিং ১৯৪২, সম্পাদনা: অনুরাধা কয়াল, মুখবন্ধ: নির্বাণ বসু, প্রগ্রেসিভ পাবলিশার্স, কলকাতা, মূল্য- ২৫০টাকা।

-সাগ্নিক চক্রবর্ত্তী (ইতিহাসের গবেষক ও শিক্ষক, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়)

অধ্যাপক বিপানচন্দ্র, স্বাধীনতা সংগ্রাম সম্পর্কিত তার প্রখ্যাত গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছিলেন, প্রতিটি প্রজন্মের উচিত নিজেদের নিজেদের মত করে স্বাধীনতা সংগ্রামের পর্যালোচনা করা। অধ্যাপিকা অনুরাধা কয়াল সম্পাদিত, রিভিজিটিং ১৯৪২ গ্রন্থটিকে বর্তমান প্রজন্মের বিদগ্ধ ইতিহাসবিদ এবং তরুণ প্রজন্মের ইতিহাস গবেষকদের চোখে ১৯৪২ এর ভারত ছাড়ো আন্দোলনকে দেখবার এরকমই একটি প্রচেষ্টা বলা যায়। বইটির মুখবন্ধ লিখেছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন মহত্মা গান্ধী চেয়ার অধ্যাপক নির্বাণ বসু। বইটিতে ষোলটি গবেষণা প্রবন্ধ রয়েছে, সম্পাদক অধ্যাপিকা অনুরাধা কয়াল বিষয়বস্তুর ওপর ভিত্তি করে বইটিকে চারটি বিভাগে বিভক্ত করেছেন।

গ্রন্থের প্রথমে, অধ্যাপক অমিত দে ও অধ্যাপক রূপকুমার বর্মণের প্রবন্ধ দুটি গ্রন্থটির তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। অধ্যাপক দে, ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ইতিহাসচর্চার বিষয়ে আলোকপাত করেছেন, অপরদিকে অধ্যাপক বর্মনের লেখা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে নতুন ভাবনার জন্ম দেয়। ভারত ছাড়ো আন্দোলনের প্রেক্ষিতে নেতাজীর ভূমিকার কথা অধ্যাপক পলাশ মন্ডলের লেখায় উঠে এসেছে।

গ্রন্থের পরবর্তী অংশের আলোচনার বিষয় ভারত ছাড়ো আন্দোলনের আঞ্চলিক বৈশিষ্ট। যেখানে অধ্যাপক প্রজিত কুমার পালিত আলোচনা করেছেন ত্রিপুরার রিং বিদ্রোহ নিয়ে, তরুণ গবেষক সৌরভ সরকারের আলোচ্য বিষয় কাছাড়ে ভারত ছাড় আন্দোলন। অপরদিকে সাগ্নিক চক্রবর্ত্তী ও ইন্দ্রনীল চট্টোপাধ্যায় আলোকপাত করেছেন, উত্তরবঙ্গে ৪২ এর আন্দোলনের বিভিন্ন দিক নিয়ে। রাজর্ষী মহাপাত্র ও অধ্যাপক শঙ্করদেব মাইতির লেখায় উঠে এসেছে মেদিনীপুরে ভারতছাড়ো আন্দোলনের বিভিন্ন প্রসঙ্গ।

গ্রন্থের তৃতীয় অংশে, ভারত ছাড়ো আন্দোলনে বিভিন্ন শ্রেণীর ভূমিকা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। অধ্যাপক নির্বাণ বসু তুলে ধরেছেন বিয়াল্লিশের আন্দোলনে শ্রমিকদের অবদানের কথা, অধ্যাপক সিদ্ধার্থ গুহরায়ের লেখায় আন্দোলনের দিনগুলিতে ট্রামকর্মীদের ভূমিকার বিষয়টি প্রতিফলিত হয়েছে। অপরদিকে অধ্যাপিকা অনুরাধা কয়াল আলোকপাত করেছেন উত্তাল চল্লিশের  দশকে হোয়াইট কলার কর্মীদের আন্দোলনের বিষয়ে, অধ্যাপক দীপঙ্কর ভট্টাচার্যের আলোচনায় উঠে এসেছে বিয়াল্লিশের আন্দোলনের দিনগুলিতে বাংলা ও বিহারের কৃষকদের কথা।

জাতি, লিঙ্গ ও বিয়াল্লিশের আন্দোলন বিষয়ক চতুর্থ অংশে, অধ্যাপক মনোশান্ত বিশ্বাস বিশ্লেষণ করেছেন বিয়াল্লিশের আন্দোলনে নমশূদ্র সম্প্রদায়ের ভূমিকার কথা। গবেষক সৌম্যদের মাইতির লেখায় উঠে এসেছে, আন্দোলনে তমলুকের পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের নারীদের ভূমিকার কথা এবং অধ্যাপক শেখ আলি আব্বাস মামুদ আলোকপাত করেছেন ভারতছাড়ো আন্দোলনের প্রখ্যাত মহিলা নেত্রী অরুণা আসফ আলির বিষয়।

বিষয়বৈচিত্র‍্য গ্রন্থটিকে স্বতন্ত্রতা প্রদান করেছে, দুই মলাটের মধ্যে বিয়াল্লিশের আন্দোলনের ষোলোটি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ের সাথে পাঠকের পরিচিত হওয়ার সুযোগ করে দেয় এই গ্রন্থ। গ্রন্থটিকে বিভিন্ন অংশে বিভক্ত করা একদিকে যেমন সম্পাদক অনুরাধা কয়ালের মুন্সিয়ানার পরিচয় দেয়, তেমনই পাঠকের কাছেও গ্রন্থটিকে সহজবোধ্য করে তোলে, সেজন্য সম্পাদকের বিশেষ ধন্যবাদ প্রাপ্য। সামান্য কিছু মুদ্রণ প্রমাদ ছাড়া তেমন কোনো ত্রুটি চোখে পড়ে না, তবে গ্রন্থটির নতুন মুদ্রণ নির্মাণে প্রকাশক ভবিষ্যতে আরো যত্নশীল হবে এই আশা রাখা যায়। প্রকাশক গ্রন্থটির মূল্য ছাত্র ও গবেষকদের নাগালের মধ্যে রেখেছে, যেটা অন্যতম ভাল লাগবার জায়গা। বর্তমানে যারা ভারতের জাতীয় আন্দোলনের ধারা নিয়ে আলোচনা ও গবেষণায় আগ্রহী তাদের কাছে গ্রন্থটি অবশ্যপাঠ্য বলা যায়।