ডিম্বানু সংগ্রহ এবং ভ্রূণ স্থানান্তরের মধ্যবর্তী ১২০ ঘণ্টায় কী ঘটে এবং কেন প্রতিটি ঘণ্টা গুরুত্বপূর্ণ

রোগীদের জন্য, ডিম্বাণু সংগ্রহ এবং ভ্রূণ স্থানান্তরের মধ্যবর্তী অপেক্ষার সময়টুকু মনে হতে পারে যেন জীবন থমকে গিয়েছে। তারা ক্লিনিকের বার্তার জন্য অপেক্ষা করেন, আর তাদের নিজেদের জীবন যেন এক জায়গায় স্থির হয়ে যায়।

কিন্তু আইভিএফ ল্যাবের ভেতরে কোনো বিরতি নেই। সেখানে সবকিছু আরও দ্রুতগতিতে চলতে থাকে। 

শিলিগুড়ির বিড়লা ফার্টিলিটি অ্যান্ড আইভিএফ-এর ফার্টিলিটি স্পেশালিস্ট ডাঃ অঙ্গনা দে-র মতে, এই পাঁচটি দিন কমবেশি ১২০ ঘণ্টা পুরো আইভিএফ প্রক্রিয়ার মধ্যে অন্যতম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়টিতে একটি ডিম্বাণু নিষিক্ত হয়, কোষ বিভাজন শুরু করে এবং প্রমাণ দেয় যে এটি গর্ভাবস্থায় রূপান্তরিত হতে সক্ষম।

ডাক্তারের টিম যখনই ডিম্বাণু সংগ্রহ করে, তারা সেগুলোকে অত্যন্ত সাবধানে  সরাসরি যথেষ্ট নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে নিয়ে যায়। ল্যাবরেটরি যতটা সম্ভব ফ্যালোপিয়ান টিউবের (জরায়ু নালী) পরিবেশকে অনুকরণ করে তৈরি করা হয়, যেখানে তাপমাত্রা, অক্সিজেন, পুষ্টি, পিএইচ সবকিছু খুব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। এমনকি সামান্য পরিবর্তনও অনেক বড় পার্থক্য মনে হতে পারে। কয়েক ঘণ্টা পর ফার্টিলাইজেশন প্রক্রিয়াটি ঘটে, যা হয় স্বাভাবিকভাবে অথবা আইসিএসআই-এর মাধ্যমে। আইসিএসআই-এ একজন এমব্রায়োলজিস্ট প্রতিটি ডিম্বাণুর ভেতরে একটি করে শুক্রাণু ইনজেক্ট করেন।

পরের দিন সকালের মধ্যেই, এমব্রায়োলজিস্টরা একটি ক্ষুদ্র কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চিহ্নের খোঁজ করেন, দুটি প্রোনিউক্লিয়াস। এটি হলো বাবা-মা উভয়ের জেনেটিক উপাদানের একত্রিত হওয়া রূপ। যখন তারা এটি দেখতে পান, তারা নিশ্চিত হন যে নিষেক বা ফার্টিলাইজেশন সফল হয়েছে এবং ভ্রূণটি আনুষ্ঠানিকভাবে তার বিকাশের পথে এগিয়ে চলেছে।

পরবর্তী দুই দিনে, ভ্রূণটি বিভাজিত হতে শুরু করে প্রথমে দুটি কোষ, তারপর চারটি, তারপর আটটি। তবে এটি কেবল কোষ গণনার বিষয় নয়। এমব্রায়োলজিস্টরা পর্যবেক্ষণ করেন যে কোষগুলো কীভাবে বিভক্ত হচ্ছে, ভ্রূণটি দেখতে কতটা সুবিন্যস্ত এবং সেখানে কোনো ভাঙা অংশ দেখা যাচ্ছে কি না। এই খুঁটিনাটি বিষয়গুলোই প্রকৃত ইঙ্গিত দেয় যে কোন ভ্রূণগুলোর আরও বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। যে ভ্রূণগুলো মসৃণভাবে বিভাজিত হয় এবং দেখতে ভারসাম্যপূর্ণ লাগে, সেগুলোর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি হয়।

চতুর্থ দিনের কাছাকাছি সময়ে, ভ্রূণগুলো একটি মাইলফলক স্পর্শ করে – তারা সংকুচিত হয়ে একটি আঁটসাঁট বলের আকার নেয় যাকে ‘মরুলা’ বলা হয়। হঠাৎ করেই, এটি আর কেবল সাধারণভাবে বিভাজিত হয়ে থাকে না। কোষগুলো একে অপরের সঙ্গে মিলে কাজ করতে শুরু করে, যা পরবর্তী পর্যায়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেয়।

পঞ্চম দিনের মধ্যে, সবচেয়ে শক্তিশালী ভ্রূণগুলো ‘ব্লাস্টোসিস্ট’ নামক পর্যায়ে পৌঁছায়। এখন সেখানে ডজন ডজন কোষ থাকে, যা দুটি স্পষ্ট স্তরে বিন্যস্ত হয়: একটি স্তর থেকে শিশু তৈরি হবে এবং অন্যটি থেকে প্লাসেন্টা বা অমরা তৈরি হবে। এই পর্যায়ে পৌঁছানোটাই প্রমাণ করে যে, ভ্রূণটি তার যাত্রাপথের সমস্ত ধরণের জৈবিক পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছে।

এই কারণেই এখন অনেক ক্লিনিক আগেভাগে ভ্রূণ স্থানান্তর না করে ব্লাস্টোসিস্ট পর্যায় পর্যন্ত অপেক্ষা করে। ল্যাবে ভ্রূণকে আরও বিকশিত হওয়ার সময় দিলে চিকিৎসকদের পক্ষে বোঝা সহজ হয় যে কোনটি প্রকৃতপক্ষে স্থিতিস্থাপক এবং পরবর্তী ধাপের জন্য প্রস্তুত।

বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে যে ভ্রূণ স্থানান্তরই সবচেয়ে বড় মুহূর্ত। কিন্তু বাস্তবে, ফলাফলের অনেকটাই নির্ভর করে এই পাঁচটি দিনের ওপর যেখানে ভ্রূণটিকে শান্ত ও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরী।

প্রতিটি মুহূর্ত এখানে মূল্যবান। ভ্রূণগুলো তাদের সঠিক সময়জ্ঞান, গঠন এবং বৃদ্ধির ধারাবাহিকতার মাধ্যমেই নিজেদের সক্ষমতার পরিচয় দেয়। আইভিএফ মানে কেবল ভ্রূণ তৈরি করা নয়, এটি মানুষের বিকাশের একদম প্রাথমিক দিনগুলোকে সরাসরি দেখার এবং সবচেয়ে উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় ভ্রূণটিকে বেছে নেওয়ার একটি বিরল সুযোগ করে দেয়।

রোগীদের কাছে এই সময়টুকু মনে হয় এক অন্তহীন প্রতীক্ষা। কিন্তু ডাক্তার এবং এমব্রায়োলজিস্টদের কাছে এটি হলো বিরতিহীন পর্যবেক্ষণ, সুরক্ষা এবং কঠিন সব সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়। এই ১২০ ঘণ্টার মধ্যেই মাসের পর মাস বা এমনকি বছরের পর বছরের পরিশ্রম সাফল্যের দিকে মোড় নিতে পারে।