আইভিএফ চিকিৎসার সময় রোগীদের মনে সবচেয়ে স্বাভাবিক যে প্রশ্নটি আসে, তা হল—যদি দুটি ক্লিনিকে একই ধরনের প্রোটোকল মেনে, একই ধরনের ওষুধ ব্যবহার করে এবং একই আইভিএফ পদ্ধতিতে চিকিৎসা করা হয়, তাহলে ফলাফল এক না হয়ে আলাদা হয় কেন? এই প্রশ্নটি অত্যন্ত স্বাভাবিক বলে জানাচ্ছেন ডাঃ অঙ্গনা দে, ফার্টিলিটি স্পেশালিস্ট, বিড়লা ফার্টিলিটি অ্যান্ড আইভিএফ-শিলিগুড়ি। তাঁর মতে, আইভিএফ-কে প্রায়ই একাধিক পরিকল্পিত ধাপের ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়—ডিম্বাশয় উদ্দীপনা, ডিম্বাণু সংগ্রহ, নিষেক, ভ্রূণের বৃদ্ধি এবং ভ্রূণ স্থানান্তর । এর ফলে অনেকের মনে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে, একবার প্রোটোকল নির্ধারণ হয়ে গেলে পরবর্তী পুরো প্রক্রিয়াটি সব ক্লিনিকেই একইভাবে সম্পন্ন হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে প্রোটোকল কেবলমাত্র শুরুর ভিত্তি। সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হল প্রতিটি ধাপ কতটা ধারাবাহিকতা ও সতর্কতার সঙ্গে সম্পন্ন করা হচ্ছে, বিশেষ করে আইভিএফ-ল্যাবরেটরির ভিতরে।
অনেক আইভিএফ কেন্দ্রই প্রয়োজন অনুযায়ী ইশেয়ার (ইউরোপীয় সোসাইটি অফ হিউম্যান রিপ্রোডাকশন অ্যান্ড এমব্রায়োলজি)-এর মতো স্বীকৃত সংস্থার নির্দেশিকা এবং প্রচলিত আইভিএফ প্রোটোকল অনুসরণ করে। তবে প্রোটোকল ও নির্দেশিকা চিকিৎসার একটি কাঠামো তৈরি করে মাত্র। চিকিৎসার ফলাফল আরও নির্ভর করে ল্যাবরেটরির পরিবেশ কতটা ধারাবাহিকভাবে বজায় রাখা হচ্ছে, ডিম্বাণু, শুক্রাণু ও ভ্রূণ কতটা যত্ন ও সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করা হচ্ছে এবং সময়-সংবেদনশীল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এমব্রায়োলজি দলের অভিজ্ঞতা কতটা সমৃদ্ধ, তার উপর। একটি আইভিএফ চক্রের সূচনা হয় চিকিৎসকের পরামর্শ কক্ষে, কিন্তু এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ধাপ সম্পন্ন হয় ল্যাবরেটরির ভিতরে। এখানেই ডিম্বাণুর মূল্যায়ন করা হয়, শুক্রাণু প্রস্তুত করা হয়, নিষেক সম্পন্ন হয়, ভ্রূণকে নির্দিষ্ট পরিবেশে বৃদ্ধি করা হয় এবং কোন ভ্রূণ স্থানান্তর বা হিমায়িত করার জন্য উপযুক্ত হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এগুলি অত্যন্ত সূক্ষ্ম জৈবিক প্রক্রিয়া, এবং পরিচালনার ধরন, সময়, তাপমাত্রা, বায়ুর গুণমান, কালচার পরিবেশ ও মূল্যায়নের মতো বিষয়গুলিতে সামান্য পার্থক্যও ভ্রূণের বিকাশকে প্রভাবিত করতে পারে। এই কারণেই একই ধরনের যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও দুটি IVF ল্যাব সবসময় একই ধরনের ফলাফল দিতে পারে না। প্রযুক্তি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শুধুমাত্র প্রযুক্তিই একটি ল্যাবরেটরির মান নির্ধারণ করে না। একটি উন্নত আইভিএফ ল্যাব নির্ভর করে স্থিতিশীল পরিবেশ, সঠিকভাবে ক্যালিব্রেট করা যন্ত্রপাতি, নিয়মিত মান নিয়ন্ত্রণ, যথাযথ নথিভুক্তিকরণ এবং এমন একটি প্রশিক্ষিত এমব্রায়োলজি দলের উপর, যারা প্রতিটি প্রক্রিয়া ধারাবাহিকতা ও নির্ভুলতার সঙ্গে অনুসরণ করেন।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় এমব্রায়োলজিস্টের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমব্রায়োলজি শুধু লিখিত প্রোটোকল অনুসরণ করার বিষয় নয়; এটি একটি বিশেষায়িত বিজ্ঞান, যেখানে প্রয়োজন নির্ভুলতা, দক্ষতা এবং সঠিক বিচারবোধ। ডিম্বাণু পরিচালনা, নিষেকের মূল্যায়ন, ভ্রূণের বিকাশ পর্যবেক্ষণ, কখন ভ্রূণ স্থানান্তর বা হিমায়িত করা হবে এবং কোন ভ্রূণ নির্বাচন করা হবে—এই সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তকে কখনওই একটি সাধারণ চেকলিস্টে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। রোগীদের জন্য এই বিষয়টি বোঝা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আইভিএফ -এর ফলাফল খুব কম ক্ষেত্রেই শুধুমাত্র একটি বিষয়ে নির্ভর করে। রোগীর বয়স, ডিম্বাশয়ের সক্ষমতা, ডিম্বাণুর গুণমান, শুক্রাণুর গুণমান, ভ্রূণের বিকাশের সম্ভাবনা, জরায়ুর স্বাস্থ্য এবং পূর্ববর্তী চিকিৎসার প্রতি শরীরের প্রতিক্রিয়া—এই সমস্ত বিষয়ই চিকিৎসার ফলাফলে প্রভাব ফেলে। ল্যাবরেটরি এই জৈবিক বিষয়গুলিকে পরিবর্তন করতে পারে না, তবে অত্যন্ত যত্ন, নির্ভুলতা এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সেগুলিকে পরিচালনা করার ক্ষেত্রে এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।এর অর্থ এই নয় যে রোগীদের আইভিএফ ল্যাবরেটরির প্রতিটি প্রযুক্তিগত বিষয় বিস্তারিতভাবে বুঝতে হবে। তবে তাঁদের জানা উচিত, ল্যাবরেটরি শুধুমাত্র চিকিৎসার একটি পরোক্ষ বা সহায়ক অংশ নয়; বরং এটি আইভিএফ চিকিৎসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও কেন্দ্রীয় স্তম্ভ। ফার্টিলিটি চিকিৎসায় প্রোটোকল বৈজ্ঞানিক ভিত্তি প্রদান করে। তবে চিকিৎসার ফলাফল সমানভাবে নির্ভর করে সেই প্রোটোকলের সঠিক বাস্তবায়ন, ধারাবাহিকতা এবং ল্যাবরেটরির শৃঙ্খলার উপর। আর সেই কারণেই একই ধরনের প্রোটোকল অনুসরণ করলেও দুটি আইভিএফ ল্যাব একেবারেই ভিন্ন ফলাফল দিতে পারে।
