আগামী ২১ মে ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের হাইভোল্টেজ নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক উত্তাপ যখন তুঙ্গে, ঠিক তারই মধ্যে নির্বাচনী প্রচারে ফলতায় পৌঁছলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। দিন দুয়েক আগেই নির্বাচনী সভা থেকে ঘোষণা করেছিলেন, ফলতার প্রতিটি পঞ্চায়েত ছুঁয়ে একটি বড় পদযাত্রা করবেন তিনি। সেই প্রতিশ্রুতি মতো মঙ্গলবার বেলা পৌনে বারোটা নাগাদ ফলতায় পৌঁছে শুরু করলেন রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের অন্যতম বড় কর্মসূচি। মঙ্গলবারের এই পদযাত্রা শুরু হয় ফলতার বঙ্গনগর ২ পঞ্চায়েতের হাসিমনগর সংলগ্ন কালীতলা মাঠ থেকে। রাজনৈতিক দিক থেকে এই স্থানটির বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। কারণ, গত ২৯ এপ্রিল বিধানসভা নির্বাচনের পর এই হাসিমনগরেই ভোট দিতে না পারার অভিযোগ তুলে পুনর্নির্বাচনের দাবিতে বিক্ষোভে সামিল হয়েছিলেন স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ। ফলে নির্বাচনের আবহে সেই এলাকা থেকেই মুখ্যমন্ত্রীর পদযাত্রা শুরু হওয়াকে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। এ দিন ফলতায় পৌঁছে প্রথমেই স্থানীয় মন্দিরে পুজো দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এরপর একটি হুডখোলা গাড়িতে চড়ে জনতার উদ্দেশে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানাতে জানাতে শুরু করেন দীর্ঘ মিছিল।
রাস্তার দুই ধারে ভিড় জমায় বিজেপি কর্মী-সমর্থকরা। বিভিন্ন জায়গায় ফুল ছিটিয়ে ও স্লোগান তুলে মুখ্যমন্ত্রীকে স্বাগত জানানো হয়। দলীয় পতাকা, ব্যানার এবং শ্লোগানে সরগরম হয়ে ওঠে গোটা এলাকা।এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তাও ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশাল পুলিশবাহিনী ও নিরাপত্তারক্ষীদের নজরদারিতে মিছিল এগোয় একাধিক পঞ্চায়েত এলাকা ঘুরে। বিজেপির স্থানীয় নেতৃত্বের দাবি, নির্বাচনের আগে এই পদযাত্রা কর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করবে এবং সাধারণ মানুষের কাছেও সরকারের বার্তা পৌঁছে দেবে।তবে শুধু পদযাত্রা নয়, এ দিনের সভা থেকে বড় রাজনৈতিক ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। একুশের বিধানসভা নির্বাচনের পর রাজ্যজুড়ে যে রাজনৈতিক হিংসার অভিযোগ সামনে এসেছিল, তা তুলে ধরে তিনি জানান, সেই সময় নিহত বিজেপির ৩২১ জন কর্মীর পরিবারের একজন সদস্যকে সরকারি চাকরি দেওয়া হবে। রাজনৈতিক হিংসায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতেই এই উদ্যোগ বলে দাবি করেন তিনি। মঙ্গলবার দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের নির্বাচনী সভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “একুশের নির্বাচনের পর বহু বিজেপি কর্মী রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন। বহু পরিবার তাদের আপনজনকে হারিয়েছে। আমরা তাঁদের পাশে রয়েছি। নিহত ৩২১ জন কর্মীর পরিবারের একজন করে সদস্যকে সরকারি চাকরির ব্যবস্থা করা হবে।”
একইসঙ্গে ফলতা ও ডায়মন্ড হারবার এলাকায় অতীতে রাজনৈতিক হিংসার শিকার হওয়া বিজেপি কর্মীদের পুনর্বাসনের বিষয়েও আশ্বাস দেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী জানান, যাঁরা বিগত দিনে আক্রান্ত হয়েছেন, মিথ্যা মামলার শিকার হয়েছেন কিংবা যাঁদের ব্যবসা বা জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাঁদের জন্য বিশেষ আর্থিক ও সামাজিক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।ফলতা ও ডায়মন্ড হারবার এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে পঞ্চায়েত ও লোকসভা নির্বাচনের সময় এই এলাকায় উত্তেজনা চরমে ওঠে। বিজেপির অভিযোগ, বিরোধী রাজনীতির কারণে বহু কর্মীকে ঘরছাড়া হতে হয়েছে, ভাঙচুর হয়েছে ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। যদিও এই অভিযোগ বারবার অস্বীকার করেছে বিরোধী শিবির। সভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেন, “ফলতায় যাঁরা আক্রান্ত হয়েছেন, যাঁদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা হয়েছে বা রুজি-রোজগার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, তাঁদের জন্য বিশেষ প্যাকেজের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। নতুন সরকারে কেউ আতঙ্কে থাকবে না। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার রাজনীতি বন্ধ হবে।”আগামী ২১ মে ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটকে ঘিরে রাজনৈতিক তরজা যখন তুঙ্গে, তখন মুখ্যমন্ত্রীর এই পদযাত্রা এবং একাধিক বড় ঘোষণা যে নির্বাচনী লড়াইয়ে নতুন মাত্রা যোগ করল, তা বলাই যায়। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ভোটের ঠিক ৪৮ ঘণ্টা আগে আক্রান্ত কর্মীদের পাশে থাকার বার্তা দিয়ে আবেগ ও সংগঠন—দুই দিক থেকেই জমি শক্ত করার চেষ্টা করল বিজেপি নেতৃত্ব। এখন দেখার, ভোটবাক্সে তার কতটা প্রভাব পড়ে।
