সোনারপুরের কৃতি চলচ্চিত্র নির্মাতা প্রসেনজিৎ চক্রবর্তীর ‘ছিঁডি পকড়’-এর ট্রেলার ও গান লঞ্চ, ছবিতে উঠে আসবে কুড়ানিদের জীবনের অজানা বাস্তবতা

পশ্চিমবঙ্গের সোনারপুরে জন্মগ্রহণকারী পরিচালক প্রসেনজিৎ চক্রবর্তী তাঁর স্বাধীন হিন্দি ছবি ‘ছিঁডি পকড়’-এর মাধ্যমে বড় পর্দায় এমন এক ব্যতিক্রমী ও উপেক্ষিত দুনিয়া তুলে ধরতে চলেছেন, যা সচরাচর দেখা যায় না। মুম্বইয়ের পিভিআর-এ আয়োজিত এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে ছবিটির ট্রেলার ও মিউজিক লঞ্চ করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে ছবি ও এর পুরো টিমকে উৎসাহিত করেন প্রবীণ অভিনেতা রাকেশ বেদী ও মকরন্দ দেশপাণ্ডে। বড় বাজেটের গ্ল্যামারাস বাণিজ্যিক সিনেমার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ‘ছিঁডি পকড়’ ছবিটি আবর্তিত হয়েছে এমন কিছু মানুষকে কেন্দ্র করে, যাঁদের জীবন কাটে আবর্জনার স্তূপে। বিশাল ডাম্পিং গ্রাউন্ড বা জঞ্জালের পাহাড়ের প্রেক্ষাপটে তৈরি এই ছবিতে কুড়ানিদের কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে। বর্জ্য পদার্থ কুড়িয়ে ও বাছাই করে জীবিকা নির্বাহ করা এই মানুষগুলোর দারিদ্র্য, আসক্তি, শোষণ, পারিবারিক লড়াই এবং মর্যাদার সাথে বেঁচে থাকার নিরন্তর সংগ্রাম ছবির মূল বিষয়বস্তু।

ছবিটির ট্রারেলে এমন এক নির্মম ও বাস্তবসম্মত দুনিয়ার ঝলক মেলে, যেখানে আবর্জনার স্তূপে শুধু বাতিল জিনিসপত্রই লুকিয়ে থাকে না, লুকিয়ে থাকে ভাঙা স্বপ্ন, চুরমার হয়ে যাওয়া সম্পর্ক এবং একটা ভালো জীবনের আশা। চরিত্রগুলোর কষ্টকে অতিরিক্ত আবেগঘন বা সেনসেশনাল না করে, তাদের মানবিক দিকটি তুলে ধরে অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সাথে গল্পটি বলার চেষ্টা করা হয়েছে।সোনারপুরে জন্ম ও পরবর্তীতে চলচ্চিত্র নির্মাণে নিজের অবস্থান তৈরি করা প্রসেনজিৎ চক্রবর্তীর কাছে ‘ছিঁডি পকড়’ কেবল একটি স্বাধীন ছবি নয়; সমাজের প্রান্তে পড়ে থাকা এই মানুষগুলোর কণ্ঠস্বরকে মূলস্রোতে তুলে আনার এক আন্তরিক প্রচেষ্টা। ছবিটি সম্পর্কে বলতে গিয়ে লেখক-পরিচালক প্রসেনজিৎ চক্রবর্তী জানান, “‘ছিঁডি পকড়’ কেবল কুড়ুনিদের গল্প নয়; এটি এমন কিছু মানুষের গল্প, যাদের আমরা প্রতিদিন দেখি কিন্তু দেখতে অস্বীকার করি। আমি সততা ও মর্যাদার সঙ্গে তাদের গল্পটি বলতে চেয়েছি। এই চরিত্রগুলোরও স্বপ্ন, সম্পর্ক, যন্ত্রণা এবং আশা রয়েছে।” ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন চিত্রালী দাস, রাজকুমার দ্বিবেদী, মনোজ করোটিয়া, মুচ্ছু এবং দেবরাজন নাগ। আসল লোকেশন, স্বাভাবিক অভিনয় এবং ডকুমেন্টারির মতো ভিজ্যুয়াল স্টাইল ছবিটিকে এক ভিন্ন মাত্রা ও স্বতন্ত্র সিনেমাটিক অভিজ্ঞতা দেবে।

‘ছিঁডি পকড়’-এর এই যাত্রা কেবল ভারতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ৭৮তম কান চলচ্চিত্র উৎসবের ‘মার্শে দু ফিল্ম’ -এ ছবিটির ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার হয়। কানের আসরে ছবিটির অফিশিয়াল পোস্টার লঞ্চ করেন প্রবীণ অভিনেতা বোমান ইরানি ও মকরন্দ দেশপাণ্ডে। কানের পর ছবিটি আন্তর্জাতিক স্বাধীন চলচ্চিত্র উৎসবেও নিজের যাত্রা অব্যাহত রাখে এবং ব্যাংকক মুভি অ্যাওয়ার্ডসসহ বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে স্বীকৃতি ও মনোনয়ন লাভ করে। মুম্বইয়ের ট্রেলার লঞ্চ অনুষ্ঠানে রাকেশ বেদী ও মকরন্দ দেশপাণ্ডের উপস্থিতি অনুষ্ঠানটিকে এক বিশেষ মাত্রা দেয়। দুই প্রবীণ অভিনেতাই ছবির বিষয়বস্তু এবং পুরো টিমের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন। পাশাপাশি, এমন সিনেমা তৈরির ওপর জোর দেন যা মূলস্রোতের আড়ালে থাকা গল্প এবং উপেক্ষিত সম্প্রদায়গুলোকে জায়গা করে দেয়। ‘ছিঁডি পকড়’-এর আরেকটি অন্যতম আকর্ষণ হলো এর সঙ্গীত। ছবিটির সংগীতের যাত্রার সাথে যুক্ত রয়েছে ‘রেড রিবন মিউজিক’। প্রকল্পটি সম্পর্কে বলতে গিয়ে ‘রেড রিবন’-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর ললিত্যা মুনশাওয়া বলেন, “ছিঁডি পকড়-এর দুনিয়াটি অত্যন্ত কাঁচা, আবেগঘন এবং গভীর মানবীয় বাস্তবতায় ভরপুর। এর সঙ্গীত এমন হওয়া প্রয়োজন ছিল যা সেই বাস্তবতাকে ছাপিয়ে না গিয়ে বরং তাকে আরও পরিপূরক করে তোলে।

জাভেদ আলী, মোহাম্মদ ইরফান এবং শ্রুতি পাঠক—সব গায়ক-গায়িকা, সঙ্গীত পরিচালক সুমন মিত্র এবং গীতিকার প্রিয়ম জি দারুণ কাজ করেছেন। এমন একটি ছবির সাথে যুক্ত থাকতে পেরে আমরা গর্বিত, যা সিনেমার মাধ্যমে এমন কিছু মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে যাদের গল্প খুব কমই শোনা যায়।” কান এবং আন্তর্জাতিক স্বাধীন চলচ্চিত্র উৎসবে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার পর, এবার ‘ছিঁডি পকড়’ ভারতীয় দর্শকদের কাছে পৌঁছানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। ছবিটির থিয়েটার ডিস্ট্রিবিউশনের দায়িত্বে রয়েছে লাভ সিংয়ের ‘থিয়েটার কিং’। সোনারপুরে জন্ম নেওয়া পরিচালক প্রসেনজিৎ চক্রবর্তীর এই ছবি এখন মুম্বইয়ের গণ্ডি পেরিয়ে সারা ভারতে একটি বড় প্রশ্ন তুলে ধরতে চলেছে: যে মানুষগুলো নিজেদের জীবন জঞ্জালের স্তূপে কাটিয়ে আমাদের শহরগুলোকে পরিষ্কার রাখেন, তাদের আমরা আসলে কতটা দেখতে পাই? ‘ছিঁডি পকড়’-এর ট্রেলার দর্শকদের সামনে ঠিক এই প্রশ্নটিই তুলে ধরে এবং এমন এক পৃথিবীর ঝলক দেখায়, যা প্রতিদিন আমাদের চারপাশে বিদ্যমান থেকেও প্রায়শই অদৃশ্যই থেকে যায়।