একটি নতুন জাতীয় সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, গর্ভাবস্থায় দীর্ঘ সময় ধরে চরম তাপপ্রবাহের মধ্যে থাকলে প্রতিকূল জন্ম-পরিণতির ঝুঁকি বেড়ে যায়, এবং এই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে সেইসব মহিলাদের ক্ষেত্রে, যারা আগে থেকেই বিভিন্ন কারণে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছেন। এই গবেষণার ফলাফল পশ্চিমবঙ্গের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ রাজ্যের বিস্তীর্ণ গ্রামীণ জনসংখ্যা আর্দ্র উপ-উষ্ণমণ্ডলীয় সমভূমি অঞ্চলে বসবাস করেন, যাকে এই সমীক্ষায় কম ওজনের শিশু জন্মের সঙ্গে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে যুক্ত করা হয়েছে।
সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, আর্দ্র উপ-উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলে তাপপ্রবাহের সঙ্গে কম ওজনের শিশু জন্মের উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক রয়েছে। এই জলবায়ু অঞ্চলটি পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ এলাকা জুড়ে বিস্তৃত।
‘ভারতে চরম তাপজনিত চাপের প্রভাবে গর্ভাবস্থার প্রতিকূল ফলাফল’ শীর্ষক এই সমীক্ষায় ২০১৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে নথিভুক্ত ২,০৯,২৬৬টি প্রসবের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে এবং প্রতিটি ক্ষেত্রেই গর্ভাবস্থার সময় মায়ের বসবাসকারী এলাকার তাপমাত্রার পরিস্থিতির সঙ্গে সেই তথ্য মিলিয়ে দেখা হয়েছে। গড় বা সর্বোচ্চ তাপমাত্রার উপর নির্ভর না করে, গবেষকরা গণনা করেছেন একজন গর্ভবতী নারী টানা কতদিন ‘অত্যন্ত গরম’ অবস্থার মধ্যে ছিলেন। এখানে ‘অত্যন্ত গরম’ বলতে সেই দিনগুলিকে বোঝানো হয়েছে, যেদিন ইন্ডিয়া হিট ইনডেক্স সংশ্লিষ্ট এলাকার দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ুগত মানের ৯০তম পার্সেন্টাইল অতিক্রম করেছে। সমীক্ষাটি পিয়ার-রিভিউড বৈজ্ঞানিক সাময়িকী এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ কমিউনিকেশনস-এ প্রকাশিত হয়েছে।
কম ওজনের শিশুর জন্ম বলতে ২,৫০০ গ্রামের কম ওজনের জীবিত নবজাতককে বোঝানো হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, অন্যান্য প্রভাবক বিবেচনায় নেওয়ার পরও গর্ভাবস্থায় টানা প্রতিটি অতিরিক্ত প্রচণ্ড গরমের দিন কম ওজনের শিশুর জন্মের সম্ভাবনা প্রায় ১ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া, গর্ভাবস্থায় কোন সময়ে তাপপ্রবাহের সংস্পর্শে আসা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম ত্রৈমাসিকে চরম গরমের সংস্পর্শ অকাল প্রসবের ঝুঁকি বাড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত, আর দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে চরম গরম কম ওজনের শিশুর জন্মের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ড–আইআইটি দিল্লি অ্যাকাডেমি অব রিসার্চ-এর গবেষকরা। গবেষণায় সহযোগিতা করেছে আইআইটি দিল্লি, ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ডের স্কুল অব পাবলিক হেলথ, ইউএনএসডব্লিউ সিডনি, ইউনিভার্সিটি অব এক্সেটার এবং কোরিয়া ইউনিভার্সিটি।
গবেষণার প্রধান লেখক এবং ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ড–আইআইটি দিল্লি অ্যাকাডেমি অব রিসার্চ-এর গবেষক ভিনীথা ভিনসেন্ট বলেন, “গর্ভাবস্থায় তাপপ্রবাহকে কেবল একটি পটভূমিগত পরিস্থিতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, একজন গর্ভবতী মা যত প্রতিটি অতিরিক্ত চরম গরমের দিনের মুখোমুখি হন, তাঁর শিশুর ঝুঁকি তত বাড়ে। আর এই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি পড়ে সেইসব নারীদের ওপর, যাঁরা আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছেন। তাপপ্রবাহের সময়কাল যত দীর্ঘ হচ্ছে, উষ্ণতর জলবায়ুর জন্য ভারতের পরিকল্পনায় গর্ভবতী নারীদের সুরক্ষাকে অবশ্যই অগ্রাধিকার দিতে হবে।”
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতেও ঝুঁকির একটি স্পষ্ট বৈষম্য রয়েছে। যেসব মায়ের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই বা শুধুমাত্র প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে তাপপ্রবাহের সংস্পর্শ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কম ওজনের শিশুর জন্ম বা মৃত শিশুর জন্মের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি, উচ্চশিক্ষিত মায়েদের তুলনায়। শহর ও গ্রাম উভয় এলাকাতেই এই ইতিবাচক সম্পর্ক লক্ষ্য করা গেছে।
গবেষণার সহ-লেখক এবং আইআইটি দিল্লির অধ্যাপক সাগ্নিক দে বলেন, “চরম তাপপ্রবাহের সবচেয়ে বেশি প্রভাব যেসব মায়ের ওপর পড়ে, তাঁদেরই সাধারণত তা মোকাবিলা করার মতো সম্পদ সবচেয়ে কম থাকে— তাঁরা দরিদ্র, কম শিক্ষিত এবং অপুষ্টিতে ভোগেন। এই সামাজিক বৈষম্যকে উপেক্ষা করে তৈরি হওয়া যেকোনো অভিযোজনমূলক পরিকল্পনা সেই নারীদের কাছেই পৌঁছাতে ব্যর্থ হবে, যাঁদের সুরক্ষা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।”
