রাজনীতির ময়দানে হাওয়া বদলাতেই ভোলবদল শুরু হয়েছে তৃণমূলের অন্দরে। বিধানসভা নির্বাচনে দলের বিপর্যয়ের পরেই এতদিনের ‘মৌন’ ও ‘বিক্ষুব্ধ’ নেতারা এবার স্বমূর্তিতে অবতীর্ণ। টিকিট না পেয়ে যারা এতদিন ঘরের কোণে অভিমান করে বসেছিলেন, ফল প্রকাশের পর তাঁরাই এখন খড়্গহস্ত দলের নীতি ও নেতৃত্বের বিরুদ্ধে। যদিও সরাসরি দলত্যাগের কথা কেউ বলছেন না, কিন্তু আক্রমণের ঝাঁজ বুঝিয়ে দিচ্ছে ফাটল কতটা গভীর।
তালিকায় সবথেকে উল্লেখযোগ্য নাম কোচবিহারের দাপুটে নেতা রবীন্দ্রনাথ ঘোষ। একদা মমতার ছায়াসঙ্গী রবি ঘোষকে এবার টিকিট দেওয়া হয়নি, এমনকি পুরসভার চেয়ারম্যান পদ থেকেও কার্যত সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। হারের পরেই বিস্ফোরক রবিবাবু বলেন, “কয়েকজন নেতার দম্ভ আর অহংকারই জেলাকে ডুবিয়েছে। অন্য দল থেকে আসা কিছু লোক নিজেদের স্বার্থে দলকে হাইজ্যাক করেছিল। তৃণমূল আজ সমাজবিরোধীদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে।” টিকিট না পাওয়ার যন্ত্রণাকে মা-বাবার মৃত্যুর শোকের সঙ্গে তুলনা করে তিনি স্পষ্ট জানান, পরবর্তী পদক্ষেপ কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেই ঠিক করবেন।
মালদার প্রাক্তন মন্ত্রী তাজমুল হোসেনের গলাতেও একই সুর। হরিশ্চন্দ্রপুরের বিদায়ী বিধায়ক ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রীকে সরিয়ে এবার নতুন মুখ আনা হয়েছিল। দলের ভরাডুবি প্রসঙ্গে তিনি সাফ জানান, এই ফলাফল মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভেরই প্রতিফলন। প্রার্থীর নাম ঘোষণা নিয়ে যে টানাপোড়েন চলেছিল, তাকেই ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হিসেবে মনে করছেন তিনি।
অন্যদিকে, আলিপুরদুয়ারে তৃণমূলের ভরাডুবির পর ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন প্রাক্তন বিধায়ক সৌরভ চক্রবর্তী। তাঁর মতে, পুরোনো কর্মীদের অবহেলা করার মাসুল দিচ্ছে দল। বিজেপি থেকে আসা সুমন কাঞ্জিলালকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া এবং তাঁকে কোণঠাসা করার বিরক্তি ধরা পড়েছে তাঁর গলায়। সৌরভের তোপ, “২০১৬ সালে জেলাকে দুহাত ভরে আসন দিয়েছিলাম, বদলে জুটেছে পিছন থেকে ছুরি মারা। কাউকে অবজ্ঞা করলে ফল যে কতটা ভয়ানক হয়, তা আজ প্রমাণিত।”
একই সুর শোনা গেছে রাজগঞ্জের দীর্ঘদিনের বিধায়ক খগেশ্বর রায়ের গলাতেও। অ্যাথলিট স্বপ্না বর্মনকে প্রার্থী করা যে সাধারণ মানুষ মেনে নেননি, তা তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন। দলের ‘ভুল সিদ্ধান্ত’ এবং প্রবীণদের ব্রাত্য করে রাখার এই চড়া মাশুল নিয়ে এখন তোলপাড় তৃণমূলের অন্দরমহল। পাশা উল্টে যেতেই যেভাবে ঘরের লোকগুলো ‘নখ-দাঁত’ বের করছে, তাতে আসন্ন দিনগুলোতে শাসক দলের অস্বস্তি যে আরও বাড়বে, তা বলাই বাহুল্য।
