হোটেলের ঘরেই ছুটির মেজাজ, জেন জি-র ভ্রমণে নয়া ট্রেন্ড ‘রুম রটিং’

বেড়াতে গিয়ে হোটেলে চেক-ইন করেই বেরিয়ে পড়া—তারপর একের পর এক দর্শনীয় স্থান ঘোরা, ছবি তোলা, ভিডিও করা এবং সব শেষে সমাজমাধ্যমে তা পোস্ট করা—ছুটির এই চেনা ছবিই কি ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে? অন্তত জেন জি-র ক্ষেত্রে তেমনটাই দেখা যাচ্ছে। তাঁদের মধ্যে ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ‘রুম রটিং’।
‘রুম রটিং’ বলতে মূলত বেড়াতে গিয়ে হোটেলের ঘরেই দীর্ঘ সময় আরামে কাটানোকে বোঝানো হচ্ছে। বাইরে ঘুরে বেড়ানোর বদলে ঘুম, সিনেমা দেখা, বই পড়া, গান শোনা কিংবা প্রিয়জনের সঙ্গে গল্প করেই সময় কাটাতে স্বচ্ছন্দ বোধ করছেন অনেকে। প্রশ্ন হল, এর কারণ কী?

এর অন্যতম কারণ হতে পারে ব্যস্ত জীবনযাত্রা। সপ্তাহভর অফিসের কাজ, পড়াশোনা, পরিবার এবং নানা দায়িত্ব সামলে যখন ছুটির সময় আসে, তখন অনেকেই নতুন করে কোনও ব্যস্ত সূচি তৈরি করতে চান না। বরং হোটেলের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে নিজের সাথে সময় কাটানোই তাঁদের কাছে হয়ে উঠছে প্রকৃত বিশ্রাম। এক শহর থেকে অন্য শহরে ছোটা, নির্দিষ্ট সময়ে কোনও পর্যটনস্থলে পৌঁছনোর তাড়া কিংবা একের পর এক জায়গা ঘুরে দেখার চাপ—এসব থেকে দূরে থাকতেই পছন্দ করছেন জেন জি-র একাংশ।

একসময় বেড়াতে যাওয়ার অন্যতম আকর্ষণ ছিল ছবি তোলা এবং তা সমাজমাধ্যমে পোস্ট করা। কোথায় গেলেন, কী খেলেন, কী দেখলেন—সবকিছুই যেন অনলাইন উপস্থিতির অংশ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু নতুন প্রজন্মের একাংশ সেই প্রবণতা থেকে কিছুটা সরে আসছে। প্রতিটি মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি করে ‘পারফেক্ট’ ছবি তৈরির বদলে, সেই মুহূর্তটিকে নিজের মতো করে উপভোগ করাই তাঁদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। অর্থাৎ, ছুটি অন্যকে দেখানোর জন্য নয়, নিজের জন্য।

তবে ‘রুম রটিং’-এর অর্থ যে বেড়াতে গিয়ে সারাক্ষণ হোটেলের চার দেওয়ালের মধ্যে বন্দি থাকা, তা নয়। জেন জি-র অনেকেই এখনও নতুন জায়গা দেখা, স্থানীয় সংস্কৃতি জানা কিংবা প্রকৃতির কাছাকাছি যেতে আগ্রহী। তবে তাঁদের কাছে সাইটসিয়িংই ভ্রমণের একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। কোনও জায়গার প্রতিটি দর্শনীয় স্থান দেখতেই হবে—এমন বাধ্যবাধকতা তাঁরা মানতে নারাজ। কখনও শহরের কোনও অলিগলিতে হাঁটা, কখনও কাছের ক্যাফেতে বসে থাকা, আবার কখনও হোটেলের বারান্দায় বসে দৃশ্য উপভোগ করাও তাঁদের কাছে ভ্রমণের অংশ।

‘রুম রটিং’ যদি কেবল নতুন জায়গা দেখার সুযোগ এড়িয়ে যাওয়ার অজুহাত হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে তার উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হতে পারে। ভ্রমণের আসল আনন্দ হয়তো লুকিয়ে আছে আরাম এবং অভিজ্ঞতার মধ্যে ভারসাম্য রাখায়। তাই কিছুটা সময় হোটেলের ঘরে নিজের মতো করে কাটানো, আবার কিছুটা সময় বাইরে বেরিয়ে নতুন জায়গা, মানুষ ও প্রকৃতিকে চেনা—এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই হতে পারে পরিপূর্ণ ছুটি।

তবে ‘রুম রটিং’ যেন নতুন অভিজ্ঞতা থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখার বা নিছক আলস্যের নতুন অজুহাত হয়ে না দাঁড়ায়। বরং ছুটির আসল আনন্দ খুঁজে নিতে হবে ভারসাম্যের মধ্যে। কখনও হোটেলের ঘরে নিজের সাথে কাটানো অবসর, কখনও আবার ঘরের বাইরে বেরিয়ে কাছের-দূরের প্রকৃতি, শহর ও অচেনা পরিবেশকে আবিষ্কার করা—এই দুইয়ের মধ্যে সুন্দর সমন্বয়ই ভ্রমণকে করে তুলতে পারে আরও অর্থবহ ও উপভোগ্য।