বর্তমান বিশ্বরাজনীতির অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে দেশবাসীর কাছে এক বিশেষ আবেদন রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। আগামী এক বছর নতুন কোনো সোনার গয়না না কেনার জন্য তিনি অনুরোধ জানিয়েছেন। আপাতদৃষ্টিতে এই অনুরোধ কিছুটা অদ্ভুত মনে হলেও, এর পেছনে রয়েছে দেশের অর্থনীতিকে এক গভীর সংকট থেকে বাঁচানোর সুচিন্তিত পরিকল্পনা।
ভারত তার প্রয়োজনীয় খনিজ তেল এবং সোনার একটি বিশাল অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করে। এই আমদানির মূল্য মেটাতে হয় মার্কিন ডলারে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে যুদ্ধংদেহী মনোভাব এবং হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের (Crude Oil) সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৭০ ডলার থেকে লাফিয়ে ১২৬ ডলারে পৌঁছেছে।
যখন তেলের দাম এভাবে বৃদ্ধি পায়, তখন ভারতকে আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ ডলার খরচ করতে হয়। এর ফলে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারে (Foreign Exchange Reserve) টান পড়ে এবং ডলারের তুলনায় ভারতীয় টাকার মান কমতে থাকে।
প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন যে, তেল একটি অত্যাবশ্যকীয় পণ্য। পরিবহন, বিদ্যুৎ এবং শিল্পখাত সচল রাখতে তেল আমদানি কমানো প্রায় অসম্ভব। কিন্তু সোনা মূলত অলঙ্কার বা সঞ্চয়ের জন্য কেনা হয়। ভারতীয়রা সোনা কিনতে অত্যন্ত আগ্রহী, বিশেষ করে বিয়ের মৌসুমে। তবে এই সংকটের সময়ে যদি সাধারণ মানুষ বিপুল পরিমাণ সোনা কেনেন, তবে সরকারকে বাধ্য হয়ে বিদেশ থেকে সোনা আমদানি করতে হবে।
এর ফলে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ ডলার বাইরে চলে যাবে, যা ভারতীয় মুদ্রার উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করবে। আমদানি ও রপ্তানির মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হলে দেশের অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। টাকা দুর্বল হওয়া মানেই মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পাওয়া, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ আরও বাড়িয়ে দেবে।
প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ, তেলের দাম বিশ্ববাজারে বাড়লেও সরকার দেশে পেট্রোল-ডিজেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে। তবে আমদানির ওপর চাপ কমাতে প্রধানমন্ত্রী গাড়ি কম ব্যবহার করে জ্বালানি সাশ্রয়ের পাশাপাশি সোনা কেনা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
ভারত সরকার এর আগেও অর্থনৈতিক সংকটের সময় সোনা আমদানিতে শুল্ক বৃদ্ধি বা আমদানির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করেছে। এমনকি সোনার বিকল্প হিসেবে ‘সভেরেন গোল্ড বন্ড’ (Sovereign Gold Bond)-এর মতো বিনিয়োগের সুযোগও আনা হয়েছিল যাতে ফিজিক্যাল সোনা আমদানির চাপ কমে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিরতা এবং সাপ্লাই চেইন বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় ভারতের অর্থনীতি এখন একটি সংবেদনশীল মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাই বিয়ের মৌসুম হলেও দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এবং মুদ্রার মান ধরে রাখতে এই বছর অতিরিক্ত সোনা না কেনাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রধানমন্ত্রীর এই আর্জি মূলত দেশপ্রেম এবং অর্থনৈতিক সচেতনতার একটি পরীক্ষা, যেখানে সাধারণ মানুষের সামান্য ত্যাগ দেশের আর্থিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করতে পারে।
