দার্জিলিং-কালিম্পংয়ে পর্যটন পরিকাঠামোয় জোর, রোপওয়ে থেকে নতুন ইভেন্টের পরিকল্পনা

পাহাড়ের পর্যটনকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে আগামী ছয় মাসের রূপরেখা তৈরি করতে শিলিগুড়ি স্টেট গেস্ট হাউসে অনুষ্ঠিত হল গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক। জিটিএ এবং পর্যটন দপ্তরের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন প্রতিমন্ত্রী বিশাল নামা, দার্জিলিং, কালিম্পং ও কার্শিয়াং এলাকার প্রশাসনিক আধিকারিক, কার্শিয়াংয়ের বিধায়ক, দার্জিলিং ও কালিম্পংয়ের ডিএম-সহ জিটিএ-র কর্তারাও। বৈঠকে পাহাড়ের পর্যটন পরিকাঠামো, যানজট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, হোমস্টে এবং নতুন পর্যটন আকর্ষণ তৈরির মতো একাধিক বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, দার্জিলিং, কালিম্পং, মিরিক, দুধিয়া, মংপু, কার্শিয়াং-সহ বিভিন্ন পর্যটন এলাকাকে এলাকা ভিত্তিকভাবে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা হবে। দার্জিলিংকে আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে আরও উন্নত করার পরিকল্পনারও প্রাথমিক পর্যালোচনা করা হয়েছে। পর্যটকদের আকর্ষণ করতে আগামী দিনে টি ফেস্টিভ্যাল, ভিন্টেজ কার র‍্যালি, ওয়াকাথন, রিভার ক্রাফটিং, প্যারাগ্লাইডিং-সহ একাধিক ইভেন্ট আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাহাড়ের পুরনো ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে সামনে রেখে বিশেষ উৎসবের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে এক ছাতার তলায় তুলে ধরতে বড় অনুষ্ঠানের পরিকল্পনাও রয়েছে।

পর্যটনের পাশাপাশি পাহাড়ের অন্যতম বড় সমস্যা যানজট ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়েও বৈঠকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দার্জিলিংয়ের যানজট কমাতে রোপওয়ে তৈরির পরিকল্পনা ইতিমধ্যেই নেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে এদিন সকালেও গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। প্রাথমিকভাবে পাঁচটি রোপওয়ে প্রকল্প নিয়ে আলোচনা চলছে। পাশাপাশি মহাকাল মন্দির, সেবকের কালীমন্দির, কালিঝোরার পুরনো বাংলো এবং মংপুতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলির পরিকাঠামো ও পর্যটন আকর্ষণ বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।

বৈঠকে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে হোমস্টে রেজিস্ট্রেশন। প্রশাসনের নজরে এসেছে, উত্তরবঙ্গের কিছু জেলায় অধিকাংশ হোমস্টে নথিভুক্ত হলেও দার্জিলিং ও কালিম্পংয়ের মতো এলাকায় এখনও বহু হোমস্টে রেজিস্ট্রেশনের বাইরে রয়েছে। পাশাপাশি পর্যটকদের পরিচয়পত্র ছাড়াই কিছু হোমস্টেতে থাকার ব্যবস্থা করার প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। দার্জিলিং ও কালিম্পংয়ের পুলিশ প্রশাসনকে কতগুলি হোমস্টে রেজিস্টার্ড এবং কতগুলি রেজিস্ট্রেশন ছাড়া চলছে, সেই বিষয়ে বিস্তারিত রিপোর্ট তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

হোমস্টে ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও ডিজিটাল করতে এবার বড় পরিবর্তনের পথে এগোচ্ছে পর্যটন দপ্তর। নতুন ব্যবস্থায় হোমস্টে রেজিস্ট্রেশন, রিনিউয়াল এবং অন্যান্য প্রক্রিয়া অনলাইনের মাধ্যমে করার ব্যবস্থা করা হবে। যারা নতুন হোমস্টে তৈরি করতে চান, তারাও সরকারি নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সরাসরি আবেদন করতে পারবেন এবং প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে পারবেন। এতদিন যে প্রক্রিয়ার বড় অংশ খাতায়-কলমে সম্পন্ন হত, তা এবার ডিজিটাল করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। খুব শীঘ্রই এ সংক্রান্ত নতুন নীতি আনার প্রস্তুতি চলছে।

পাশাপাশি পর্যটন শিল্পের নীতিতেও পরিবর্তন আনার উদ্যোগ চলছে। হোমস্টে পলিসি এবং ট্যুরিজম ইন্ডাস্ট্রি পলিসি নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজ্য মন্ত্রিসভায় বিশেষ আলোচনা হয়েছে। পর্যটন শিল্পকে আরও ডিজিটাল করার পাশাপাশি পর্যটন দপ্তরের ওয়েবসাইটগুলিকেও নতুন করে সাজানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পর্যটকদের জন্য পরিষেবা ও তথ্য আরও সহজলভ্য করাই এর লক্ষ্য।

পর্যটন দপ্তরের হাতে থাকা জমি এবং পাহাড়ের বিভিন্ন সরকারি পর্যটন সম্পত্তিকেও নতুন করে উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। দীর্ঘ সময় পর পর্যটন খাতে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে ৫৭ কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ পাওয়ার বিষয়টিকেও এই উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে কাজে লাগানোর কথা ভাবা হচ্ছে।

এবারের দুর্গাপুজোকেও পাহাড়ের পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। দার্জিলিংয়ের চকবাজার ও ম্যাল রোড নতুনভাবে সাজিয়ে আলোকসজ্জা করা হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজনের মাধ্যমে পুজোর সময় পাহাড়ে পর্যটকদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে।

সব মিলিয়ে, পর্যটনকে কেন্দ্র করে পাহাড়ে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, রাজস্ব সংগ্রহ, পরিকাঠামোর উন্নয়ন, পরিচ্ছন্নতা এবং পর্যটকদের অভিজ্ঞতা উন্নত করাই আগামী দিনের মূল লক্ষ্য বলে বৈঠকে গুরুত্ব পেয়েছে।