অপরাজিতা মৈত্র
‘এক কাপ চায়ে আমি তোমাকে চাই’। বাঙালি মাত্রেই কম বেশি এই গানের লাইনের সঙ্গে পরিচিত। বাঙালির চা-বিলাস অন্যান্য ভারতীয়দের থেকে বেশি। তবে শুধুই চা নয় চায়ের সঙ্গে কফিও বর্তমান ‘বঙ্গ জীবনের এক অঙ্গ’।
আর এই কফির কাপে চুমুক দিতে চাইলে ঘুরে আসা যায়, দক্ষিণ ভারতের কেরালার ‘ওয়েনাড’-এ। অতি সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে আমাদের অনেকের কাছেই নামে চেনা এই জায়গা। তবে শুধুই কফি নয় সঙ্গে আছে প্রাচীন গুহাচিত্র ও চায়ের সমাহারও। হ্যাঁ, কেরালার ওয়েনাড ও তার আশেপাশে বেশ কিছু চা বাগানও আছে।
ওয়েনাড কেরালা রাজ্যের উত্তর-পূর্ব দিকে পশ্চিমঘাট পর্বতমালার মধ্যে অবস্থিত। কালিকট বিমানবন্দর ওয়েনাডের নিকটবর্তী বিমানবন্দর। এখানে নেমে গাড়ি ভাড়া করে গন্তব্যে যাওয়া যায়। এছাড়া দক্ষিণ ভারতের যে কোন জায়গা থেকে সরকারি বা বেসরকারি বাসে বা রেলপথে কোকিঝোর রেলস্টেশন থেকে পৌঁছানো যায়। এইসব জায়গা থেকে হোটেল পর্যন্ত যাওয়ার জন্য স্থানীয় পরিবহণ ভরসা তবে অনেক সময়ে বেশ কিছু হোটেলের নিজস্ব গাড়ির ব্যবস্থাও আছে।
ওয়েনাড কেরালার কফি উৎপাদনকারী জায়গাগুলির মধ্যে অন্যতম। অক্টোবর থেকে মার্চ মাসের মধ্যে কফিগাছে বোল আসা শুরু হয়। শীত শুরুর আগের হাল্কা বৃষ্টিতে ফুটে উঠতে থাকে কফি ফুল। কফি ফুলের তীব্র গন্ধের সঙ্গে মিল আছে জুঁই ফুলের সুবাসের। কফি ছাড়াও গোলমরিচ চাষও হয় এখানে।
এখানে যেসব হোটেল বা রিসর্টগুলিতে থাকা হয় সেগুলির বেশীরভাগই কফি জঙ্গল বা কফি প্ল্যান্টেশানের ভেতরে অবস্থিত। আর তাই হয়ত অনেক সময়ে পশ্চিমঘাট পর্বতমালায় অবস্থিত বেশ কিছু বন্য জন্তু সহজে দেখা যায়। রাতের দিকে তাই প্রকৃতিকে নিজের মতন ঘরের মধ্যে থেকে বা হোটেলের লবিতে বসে উপভোগ করা ভালো।
ওয়েনাড গেলে অবশ্যই দেখা উচিৎ ‘এডাক্কাল গুহা’। মালায়ালাম ভাষায় ‘এডাক্কাল’ মানে দুটি গুহার মধ্যবর্তী স্থান। ঐতিহাসিক এই গুহা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩৯০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত। গাড়ি যেখানে নামাবে সেখান থেকে বেশি কিছুটা পথ হেঁটে যেতে হয়। এই পথের দু’ধারে স্থানীয় মানুষদের বিভিন্ন পসরা সাজিয়ে বসতে দেখা যায়। সে পসরায় কফির সঙ্গে থাকে হোমমেড চকলেট, বিভিন্ন মশলা ও আরও অনেক কিছু। একটু দেখে কিনতে পারলে বেশ ভালো জিনিস পাওয়া যায়।
এড্ডাকালে (প্রস্তর যুগ থেকে) আনুমানিক ৬,০০০ পূর্ব সাধারণাব্দ থেকে ১,০০০ পূর্ব সাধারণাব্দের সময়ে মানুষের বসবাস ছিল। এই সময়ের বেশ কিছু গুহাচিত্র এখনও এখানে দেখা যায়। ভারতের অন্যতম প্রাচীন এই গুহাচিত্রগুলি থেকে ইতিহাসের সুপ্রাচীন এক অধ্যায়কে কাছ থেকে দেখার এক অপূর্ব অনুভূতি হয় এখানে এলে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক গবেষণা থেকে জানা গেছে যে, এখানে মানবসভ্যতার বিকাশের বিভিন্ন সময়ে মানুষ থেকেছে। ১৮৯০ সালে এই গুহাটি আবিষ্কৃত হয়।
এডাক্কালের প্রাচীন ইতিহাসের সুবাস হাতে মেখে যদি আরও কিছু সময় থাকে তবে এই একই দিনে দেখে নেওয়া যায় ওয়েনাডের প্রাচীন জৈন মন্দির। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে কর্নাটক ও তামিলনাড়ু থেকে কেরালায় চলে আসা জৈনদের হাতেই এই মন্দিরটি তৈরি হয় বলে জানা যায়।
এছাড়াও দর্শনীয় স্থানের তালিকায় আছে ‘বানসাগর’ ড্যাম্প, ‘দ্যা হার্ট’ লেক সহ বেশ কিছু লেক ও ‘দ্য ফ্যান্টম রক’। ফ্যান্টম রকটি আদতে দূর থেকে দেখতে মানুষের কঙ্কালের মতন। কালপেট্টা থেকে ১৭ কিমি দূরে অবস্থিত এই রকে ইচ্ছে করলে একটি ছোট ট্রেক করেও পৌঁছানো যায়।
পশ্চিমঘাট পর্বতমালার মধ্যে অবস্থিত ওয়েনাডে গেলে প্রকৃতির সঙ্গে দেখা পাবেন সুপ্রাচীন মানবসভ্যতার নিদর্শনের। কফি ও মশলার বাগানের সুবাস নিতে নিতে কিছু কেরালার চা বাগানও মনকে আরাম দেবে। আর রসনা? কেরালার খাদ্যসম্ভার বাঙালির রসনাকে তৃপ্ত করতে সক্ষম। শুধু মাছ-মাংসই নয়, কেরালার মানুষ যে সব সব্জি খান তার অনেক কিছুই বাঙালি হেঁসেলের নিত্যদিনের সঙ্গী, পার্থক্য শুধু রন্ধনপ্রণালীতে।
তাই পরের বারের কেরালা ভ্রমণের তালিকায় ‘ওয়েনাড’ আপনাদের তালিকায় জায়গা করে নিতেই পারে। শুধু অতি বর্ষায় কোন পার্বত্য অঞ্চলেই না যাওয়া ভালো, তা সে হিমালয় হোক কিম্বা পশ্চিমঘাট।
