ঝুলন উৎস্বেও চরম মন্দা কৃষ্ণনগরের ঘূর্ণিতে, মাটির পুতুল শিল্প ছেড়ে বিকল্প জীবিকার মুখে মৃৎশিল্পীরা

ঝুলন উৎসবের ঠিক মুখটিতেও নদিয়ার কৃষ্ণনগরের ঘূর্ণির বিশ্বখ্যাত ঐতিহ্যবাহী মাটির পুতুল শিল্পে নেমে এসেছে চরম হতাশার ছায়া। ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই (GI) স্বীকৃতি মিললেও বাস্তব চিত্রে যে সামান্যতম বদল ঘটেনি, কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্পীদের দৈনন্দিন জীবনসংগ্রামই তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। মরসুমের এই ব্যস্ত সময়েও পুতুল বিক্রি না হওয়ায় চরম আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন শিল্পীরা, যার ফলে বাধ্য হয়ে অনেকে শতাব্দিপ্রাচীন ঐতিহ্যবাহী এই পেশা ছেড়ে বেছে নিচ্ছেন বিকল্প রুজি-রুটি।

ঘূর্ণি পুতুলপট্টির প্রায় ৩০ বছরের অভিজ্ঞ শিল্পী আনন্দ দাস এবং প্রায় ৫৯ বছর বয়সী বংশানুক্রমিক মৃৎশিল্পী বিমল পালের কণ্ঠে ফুটে উঠেছে এই সংকটের করুণ ছবি। তাঁদের মতে, আগে ঝুলন উৎসব মানেই ছিল মাটির ছোট পুতুল ও মূর্তির বিপুল চাহিদা। দেব-দেবী, গোপাল, বাউল-বাউলানি, কীর্তনের সেট, গ্রাম্য জীবন বা আদিবাসী সেটের পুতুল কিনতে ভিড় জমাতেন ভক্ত ও ক্রেতারা। কিন্তু গত এক দশকে ডিজিটাল মাধ্যমের বিস্তার এবং বাজারে প্লাস্টিক, ফাইবার, মেটাল ও স্টোন ডাস্টের পুতুলের ব্যাপক দাপটে মাটির তৈরি জিনিসের প্রতি মানুষের আর আগের মতো আগ্রহ নেই। শিশুদের মধ্যেও আর মাটির পুতুল নিয়ে খেলার সেই আকর্ষণ দেখা যায় না।

“মাত্র ২০ টাকা থেকে শুরু হওয়া পুতুলও দোকানে দিনভর বসে থেকেও বিক্রি হচ্ছে না, বহু দিন তো বউনি পর্যন্ত হয় না। জিআই স্বীকৃতি পেলেও আমাদের মতো ছোট শিল্পীদের পেটে ভাত উঠছে না।”

আনন্দ দাস, কৃষ্ণনগরের প্রান্তিক মৃৎশিল্পী

পরিস্থিতি এমনই যে শিল্পী পরিবারের নতুন প্রজন্ম এই পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। সংসার চালাতে বাধ্য হয়ে যুবকরা এখন টোটো চালানো কিংবা সবজি বিক্রির মতো কাজ বেছে নিচ্ছেন। শিল্পীদের অভিযোগ, বড় নামী শিল্পীরা সমস্ত সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেলেও প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র মৃৎশিল্পীদের কথা কেউ ভাবে না। কৃষ্ণনগরের ঘূর্ণির এই বিশ্বখ্যাত লোকশিল্পকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে অবিলম্বে সরকারি হস্তক্ষেপ, সুনির্দিষ্ট বিপণন ব্যবস্থা এবং আর্থিক সহায়তার দাবি জানিয়েছেন মৃৎশিল্পীরা। তা না হলে বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ লোকশিল্প অচিরেই ইতিহাস হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন অভিজ্ঞ মহল।