পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটগ্রহণের প্রাক্কালে পাহাড়ের রাজনীতিতে বইছে পরিবর্তনের হাওয়া। দার্জিলিং, কার্শিয়াং এবং কালিম্পং—এই তিন বিধানসভা আসনে গত তিন দশকের মধ্যে এবারই সবচেয়ে তীব্র ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বুধবার প্রচারের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটলেও পাহাড়ের অলিগলিতে এবং চায়ের দোকানে মূল আলোচনা এখন একটাই—ক্ষমতার রাশ কার হাতে থাকবে?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পাহাড়ের নির্বাচনী ইতিহাসে ১৯৮৮ সালে জিএনএলএফ-এর উত্থানের পর থেকে দীর্ঘ সময় একতরফা ভোট হওয়ার রেওয়াজ ছিল। ১৯৯১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত সুভাষ ঘিসিংয়ের দাপটে বাকি দলগুলো কার্যত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছিল। পরবর্তীকালে বিমল গুরুংয়ের মোর্চাও ২০১১ এবং ২০১৬ সালে পাহাড়ের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখেছিল। এমনকি ২০২১ সালের নির্বাচনেও লড়াই ছিল মূলত মোর্চার বিনয় তামাং গোষ্ঠী এবং বিজেপির মধ্যে। কিন্তু ২০২৬ সালের এই নির্বাচনে অনীত থাপার নেতৃত্বাধীন ভারতীয় গোর্খা প্রজাতান্ত্রিক মোর্চা (BGPM), অজয় এডওয়ার্ডসের ইন্ডিয়ান গোর্খা জনশক্তি ফ্রন্ট (IGJF) এবং বিজেপি—এই তিন শক্তির সমানে সমানে টক্কর পাহাড়ের লড়াইকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।
মাঠে-ঘাটে প্রচার বন্ধ হলেও লড়াইয়ের ভরকেন্দ্র এখন সোশ্যাল মিডিয়া। সব দলের সমর্থকরাই একে অপরের উদ্দেশ্যে পাল্টা যুক্তি ও ভিডিওর মাধ্যমে শেষ মুহূর্তের প্রচারে ব্যস্ত। এবারের নির্বাচনের অন্যতম বড় আকর্ষণ হলো তরুণ প্রজন্মের ভোটারদের অংশগ্রহণ। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (SIR) পর অনেক প্রবাসী পাহাড়ি নাগরিক নিজেদের প্রথম ভোট দিতে বাড়ির পথে রওনা দিয়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, ভোটার তালিকার এই সংশোধনী এবারের নির্বাচনকে পাহাড়বাসীর অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবেও চিহ্নিত করেছে।
উল্লেখ্য, ২০২২ সালের জিটিএ নির্বাচনে পাহাড়ে ভোটদানের হার ছিল মাত্র ৫৬.৫ শতাংশ, যা যথেষ্ট উদ্বেগজনক ছিল। তবে এবারের চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। এলাকার শিক্ষিত যুবসমাজ এবং বাইরে কর্মরত শ্রমিকরা দলে দলে ফিরে আসছেন ভোট দিতে। তাঁদের মতে, এবারের নির্বাচনে তাঁদের অংশগ্রহণ পাহাড়ে নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।
মঙ্গপু বা দার্জিলিং মোটর স্ট্যান্ড—সব জায়গাতেই সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রবল উৎসাহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিশেষ ঘোষণা না করলেও পাহাড়ের মানুষ মনে করছেন, এবারের উচ্চ ভোটদানের হার পাহাড়ের আগামী দিনের রাজনৈতিক গতিপথ বদলে দিতে পারে। দীর্ঘ কয়েক দশকের একাধিপত্য ভেঙে পাহাড়ের রাজনীতি এবার সত্যিকারের বহুত্ববাদী ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের সাক্ষী হতে চলেছে।
