সংরক্ষণ, পর্যটন, বনবাসীর জীবন-জীবিকা ও বনাধিকার—পরিকল্পনার সমন্বয়হীনতার প্রশ্নে রাজাভাতখাওয়া
অরুণ কুমার, রাজাভাতখাওয়া, আলিপুরদুয়ার
বক্সায় বাঘ ফিরেছে।
উৎসব হয়েছে।
অভিনন্দন হয়েছে।
বন দপ্তর থেকে প্রশাসন—সবার কাছে এটি সংরক্ষণের এক নতুন অধ্যায়।
কিন্তু সেই উৎসবের আড়ালে রাজাভাতখাওয়ার জঙ্গলের ভিতরে বসবাসকারী মানুষগুলির দিকে তাকালে ছবিটা কি একই রকম?
একদিকে বাঘের প্রত্যাবর্তন, অন্যদিকে মানুষের রুটি-রুজির অনিশ্চয়তা।
একদিকে আন্তর্জাতিক মানের ইকো-ট্যুরিজমের স্বপ্ন, অন্যদিকে পর্যটন বন্ধ হলে গাড়িচালক, গাইড, হোমস্টে মালিক, ছোট ব্যবসায়ী ও বনবস্তির মানুষের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা।
একদিকে বন ও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ, অন্যদিকে বনবাসীর জীবনযাত্রা, বসতভিটে, যাতায়াত, বাড়িঘর মেরামত এবং বনাধিকার নিয়ে প্রশ্ন।
তাহলে প্রশ্নটা কি শুধুই—
বক্সায় বাঘ ফিরল কি না?
নাকি আরও বড় প্রশ্ন হল—
বাঘ ফিরল, কিন্তু বক্সার মানুষের সঙ্গে সেই প্রত্যাবর্তনের সমন্বয় কতটা হল?
সীমান্তের বক্সা—শুধু একটি জঙ্গল নয়
পশ্চিমবঙ্গের আলিপুরদুয়ার জেলার বক্সা টাইগার রিজার্ভ উত্তরবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বনভূমি। উত্তরে আন্তর্জাতিক সীমান্ত পেরিয়ে ভুটান, পূর্বদিকে অসমের সঙ্গে সংযোগ। বক্সা বৃহত্তর উত্তর-পূর্ব ভারতের বনভূদৃশ্যের সঙ্গে যুক্ত এবং ভুটানের ফিপসু ও অসমের মানসসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণ এলাকার সঙ্গে এর পরিবেশগত যোগাযোগ রয়েছে।
১৯৮৩ সালে বক্সা টাইগার রিজার্ভের মর্যাদা পায়। বর্তমানে এর মোট এলাকা প্রায় ৭৬০.৮৭ বর্গকিলোমিটার; এর মধ্যে ৩৯০.৫৮ বর্গকিলোমিটার ক্রিটিক্যাল টাইগার হ্যাবিট্যাট এবং প্রায় ৩৭০.২৮ বর্গকিলোমিটার বাফার এলাকা।
এই ভূগোলের গুরুত্ব শুধু মানচিত্রে নয়।
এটি হাতি, গাউর, চিতাবাঘ, মেঘলা চিতা, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, সরীসৃপ, প্রজাপতি এবং বহু বিরল উদ্ভিদের আবাসস্থল। অর্থাৎ বক্সা একটি জীবন্ত ecological landscape।
কিন্তু সেই জীবন্ত ভূদৃশ্যের মধ্যেই মানুষও বসবাস করেন।
সরকারি মূল্যায়ন অনুযায়ী বক্সা ও তার আশপাশে রয়েছে ৩৭টি বনবসতি, ৪৬টি ফ্রিঞ্জ ভিলেজ, ৩৪টি চা-বাগান এবং চারটি Fixed Demand Holding।
অর্থাৎ বক্সার গল্পে বাঘ যেমন বাস্তব, মানুষও তেমনই বাস্তব।
জঙ্গলের ভিতরের মানুষ—তাঁরা কি শুধু “চাপ”?
সংরক্ষণ নিয়ে আলোচনা হলে আমরা প্রায়ই বলি—মানুষের চাপ কমাতে হবে।
কিন্তু একটু থামা দরকার।
যে মানুষটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম বনের সঙ্গে বসবাস করেছেন, তাঁর জীবনযাপনকে শুধু “anthropogenic pressure” বলে চিহ্নিত করলেই কি সমস্যার সমাধান হয়?
তাঁর বাড়ি আছে। পরিবার আছে। সন্তানের পড়াশোনা আছে। অসুস্থ বাবা-মায়ের চিকিৎসা আছে। বাড়ি মেরামত করার প্রয়োজন আছে। জীবিকা আছে। কৃষি, পশুপালন, ক্ষুদ্র ব্যবসা, পর্যটন, গাইডের কাজ, গাড়ি চালানো—বিভিন্ন উপায়ে সংসার চলে।
সেই মানুষের কাছে বন কেবল সংরক্ষিত এলাকা নয়। বনই তাঁর জীবনভূমি।
এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে শুধু বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের প্রশাসনিক কাঠামো দিয়ে বক্সার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করলে সংঘাত তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
রাজাভাতখাওয়ার আন্দোলন তাই হঠাৎ তৈরি হয়নি
এখন রাজাভাতখাওয়ায় যে প্রতিবাদ দেখা যাচ্ছে, তাকে শুধু পর্যটন বন্ধের ক্ষোভ হিসেবে দেখলে বিষয়টি ছোট করে দেখা হবে।
২০২৬ সালের জুনেও বক্সার বনবসতিতে পর্যটন-প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, বাড়িঘর মেরামতের জন্য নির্মাণসামগ্রী নিয়ে যাওয়া এবং বনাধিকার নিয়ে অভিযোগ ঘিরে প্রতিবাদ হয়েছিল। আন্দোলনকারীদের একাংশ অভিযোগ করেছিলেন, বিধিনিষেধের ফলে তাঁদের বনাধিকার সংকুচিত হচ্ছে।
অর্থাৎ আজকের প্রশ্নের শিকড় আরও গভীরে।
এটি কেবল—
“পর্যটন কবে খুলবে?”
এই প্রশ্ন নয়।
এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে—
“বনে বসবাসকারী মানুষের জীবন কীভাবে চলবে?”
“তাঁদের অধিকার কী?”
“সংরক্ষণ পরিকল্পনায় তাঁদের অংশগ্রহণ কতটা?”
“বনাধিকার আইন বাস্তবে কতটা কার্যকর?”
এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—
“বক্সার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি মানুষকে সঙ্গে নিয়ে তৈরি হচ্ছে, নাকি মানুষের উপর তৈরি হচ্ছে?”
বাঘের প্রত্যাবর্তন—ঐতিহাসিক, কিন্তু পরিকল্পনাও কি সমন্বিত?
২ অক্টোবর ভাল্মীকি টাইগার রিজার্ভ থেকে একটি বাঘিনীকে বক্সায় পুনঃপ্রবর্তন করা হয়েছে। এটি একটি পর্যায়ক্রমিক বাঘ পুনরুদ্ধার কর্মসূচির সূচনা। কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রকের প্রকাশিত তথ্যেও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি Community Participation-এর গুরুত্ব উল্লেখ করা হয়েছে।
এই কথাটিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ বাঘ পুনঃপ্রবর্তন কোনও একদিনের ঘটনা নয়।
বাঘ আসবে।
তার জন্য habitat management হবে।
শিকারভিত্তি বাড়াতে হবে।
করিডর সুরক্ষিত রাখতে হবে।
মানুষ-বন্যপ্রাণ সংঘাত কমাতে হবে।
পর্যটন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
পর্যটনের নতুন পরিকাঠামো তৈরি হতে পারে।
আর তার প্রতিটি পর্যায়েই বনবাসীর জীবনকে বিবেচনায় রাখতে হবে।
অর্থাৎ Tiger Reintroduction Plan-এর সঙ্গে Human Livelihood Plan-ও থাকা দরকার।
বাঘের জন্য যদি পরিকল্পনা থাকে, মানুষের জন্য সমান্তরাল পরিকল্পনা কোথায়?
পর্যটনই যখন জীবিকার বড় ভরসা
বক্সা শুধু বাঘের জন্য বিখ্যাত নয়।
বক্সা ফোর্ট, জয়ন্তী, রাজাভাতখাওয়া, লেপচাখা, পাহাড়ি পথ, নদী, অরণ্য, পাখি, প্রজাপতি—সব মিলিয়ে এই অঞ্চল উত্তরবঙ্গের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনভূমি।
সরকারি মূল্যায়ন অনুযায়ী বক্সা টাইগার রিজার্ভে বছরে গড়ে প্রায় ৫৮ হাজার পর্যটকের আগমন ঘটে এবং রাজাভাতখাওয়া পর্যটকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ reception ও interpretation কেন্দ্র।
এই পর্যটন থেকে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে বহু মানুষের আয়।
গাড়ি।
সাফারি।
গাইড।
হোমস্টে।
লজ।
ছোট দোকান।
স্থানীয় হস্তশিল্প।
খাবারের ব্যবসা।
পরিবহণ।
এমনকি পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত ছোট ছোট পরিষেবাও।
ফলে পর্যটন বন্ধ হওয়া মানে শুধু একটি গেট বন্ধ হওয়া নয়।
কোনও কোনও পরিবারের রান্নাঘরের আগুনও ধীর হয়ে যাওয়া।
২ অক্টোবর বাঘিনী পুনঃপ্রবর্তনের পর পর্যটকদের প্রবেশ ৯ অক্টোবর পর্যন্ত সীমিত করার সিদ্ধান্তে পর্যটন ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বন দফতরের বক্তব্য, নতুন পরিবেশে বাঘিনীর নিরাপত্তা ও অভিযোজনের স্বার্থে এই বিধিনিষেধ জরুরি।
দুই পক্ষের যুক্তিই বাস্তব।
তাই সমাধানও একপাক্ষিক হতে পারে না।
তাহলে ঘাটতি কোথায়?
এখানেই আসছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি।
পরিকল্পনার সমন্বয়ে কি কোথাও ঘাটতি থেকে যাচ্ছে?
বাঘ পুনঃপ্রবর্তনের পরিকল্পনা আছে।
পর্যটন উন্নয়নের পরিকল্পনা আছে।
ইকো-ট্যুরিজমের পরিকল্পনা আছে।
বন সংরক্ষণের পরিকল্পনা আছে।
কিন্তু বনবাসীর জীবন-জীবিকা, অধিকার, বাড়িঘর, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবহণ এবং বিকল্প আয়ের পরিকল্পনা কি একই নথিতে, একই টেবিলে, একই গুরুত্বে এসেছে?
যদি এসে থাকে, তা হলে তার বাস্তব প্রতিফলন কোথায়?
আর যদি না এসে থাকে, তাহলে এখনই তা সংশোধন করা জরুরি।
কারণ সংরক্ষণ এবং মানুষের জীবনকে পরস্পরের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দিলে শেষ পর্যন্ত কোনও পক্ষই জিতবে না।
বনাধিকার আইন—শুধু কাগজে থাকলে চলবে না
বনবাসীর অধিকার নিয়ে আলোচনা করতে গেলে Forest Rights Act, 2006-কে পাশ কাটিয়ে যাওয়া যায় না।
এই আইনের উদ্দেশ্যই হল বননির্ভর তফসিলি উপজাতি ও অন্যান্য ঐতিহ্যগত বনবাসীদের স্বীকৃত অধিকারকে আইনি কাঠামোর মধ্যে আনা।
তাই বক্সার বনবস্তিতে বসবাসকারী মানুষের ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠলে—
বসতভিটের অধিকার কী?
জীবিকার অধিকার কী?
প্রথাগত ব্যবহার ও বননির্ভরতার স্বীকৃতি কোথায়?
বাড়িঘর মেরামতের ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা কী?
যদি কোনও এলাকা থেকে পুনর্বাসনের প্রশ্ন আসে, তার আইনি প্রক্রিয়া কী?
কার সম্মতি নেওয়া হয়েছে?
কী ক্ষতিপূরণ?
কী বিকল্প জীবিকা?
পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ কী?
এসব প্রশ্নের উত্তর সংরক্ষণবিরোধী প্রশ্ন নয়।
বরং এগুলিই টেকসই সংরক্ষণের পূর্বশর্ত।
পুনর্বাসন হলে মানুষকে সরিয়ে নয়, মানুষকে বুঝিয়ে
বক্সার কোর এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে ভবিষ্যতে কোথাও স্থানান্তরের প্রয়োজন হলে সেই প্রক্রিয়া নিয়েও স্বচ্ছতা অপরিহার্য।
কারণ একটি পরিবারকে ভৌগোলিকভাবে সরিয়ে দেওয়া আর একটি পরিবারকে নতুন জীবনে পুনর্বাসিত করা এক জিনিস নয়।
শুধু বাড়ি দিলে হয় না।
দরকার—
জমি বা বাসস্থানের নিরাপত্তা, জলের ব্যবস্থা, রাস্তা, স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, বিদ্যুৎ, জীবিকার সুযোগ, সামাজিক নিরাপত্তা, এবং সর্বোপরি—মানুষের মর্যাদা।
জোর করে উচ্ছেদ নয়।
ভয় দেখিয়ে স্থানান্তর নয়।
আইন, সম্মতি, আলোচনা এবং পুনর্বাসনের পূর্ণ প্যাকেজ ছাড়া কোনও পুনর্বাসনই মানুষের আস্থা তৈরি করতে পারে না।
বাঘের অর্থনীতি বনবাসীর অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হোক
এখন সময় এসেছে বক্সার পর্যটন মডেল নতুন করে ভাবার।
কেন স্থানীয় বনবাসী শুধু দর্শক হবেন?
কেন তাঁরা গাইড হবেন না?
কেন তাঁদের হোমস্টে উন্নত করা হবে না?
কেন স্থানীয় যুবকদের nature guide, bird guide, wildlife interpreter হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে না?
কেন স্থানীয় মহিলাদের স্বনির্ভর গোষ্ঠী পর্যটন সরবরাহ ব্যবস্থার অংশ হবে না?
কেন স্থানীয় পণ্য, হস্তশিল্প, খাদ্য ও সংস্কৃতি পর্যটনের অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হবে না?
বক্সায় এমন একটি Community-based Sustainable Tourism Model গড়ে উঠতে পারে, যেখানে পর্যটক আসবেন, বন সংরক্ষিত থাকবে এবং সেই পর্যটন থেকে স্থানীয় মানুষের আয় বাড়বে।
সরকারি মূল্যায়নে বক্সায় ৬৩টি Joint Forest Management Committee-র কথা উল্লেখ রয়েছে এবং পর্যটন আয়ের একটি অংশ JFMC-র মাধ্যমে স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় যাওয়ার কাঠামোও রয়েছে।
তাহলে প্রশ্ন—
এই অংশীদারিত্বকে আরও গভীর করা যায় না কেন?
বক্সায় নতুন সমীকরণ দরকার
বক্সার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় অন্তত পাঁচটি বিষয়কে একই ছাতার নিচে আনতে হবে—
১. Tiger Conservation
বাঘ ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করা।
২. Forest Rights
বনবাসীর আইনগত অধিকার বাস্তবে কার্যকর করা।
৩. Livelihood Security
সংরক্ষণজনিত বিধিনিষেধে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের বিকল্প ও স্থায়ী জীবিকার ব্যবস্থা করা।
৪. Community-based Tourism
পর্যটনের লাভের বৃহত্তর অংশ স্থানীয় অর্থনীতিতে ফিরিয়ে আনা।
৫. Transparent Governance
বড় সিদ্ধান্তের আগে বনবাসী, পর্যটন ব্যবসায়ী, স্থানীয় প্রশাসন, বন দপ্তর এবং বিশেষজ্ঞদের নিয়ে নিয়মিত পরামর্শ ব্যবস্থা তৈরি করা।
এগুলো আলাদা পাঁচটি বিষয় নয়।
একই বক্সার পাঁচটি স্তম্ভ।
এবার প্রশ্ন প্রশাসনের কাছেই
বাঘকে আমরা বাঁচাতে চাই।
বনকেও বাঁচাতে চাই।
পর্যটনকেও বাড়াতে চাই।
কিন্তু সেই সঙ্গে বনবাসী মানুষকেও বাঁচাতে হবে।
তাই প্রশাসনের কাছে প্রশ্ন থাকা উচিত—
বাঘ পুনঃপ্রবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সঙ্গে বনবাসীর জীবন-জীবিকার সমন্বিত পরিকল্পনা কোথায়?
Forest Rights Act-এর বাস্তব প্রয়োগের বর্তমান চিত্র কী?
কোর ও বাফার এলাকার বনবাসীদের জন্য কী পৃথক livelihood plan রয়েছে?
পর্যটন বন্ধ হলে ক্ষুদ্র পর্যটন-নির্ভর পরিবারগুলির জন্য কোনও compensation বা livelihood support mechanism আছে কি?
বড় পর্যটন প্রকল্প এলে স্থানীয় মানুষ কতটা অংশীদার হবেন?
ভবিষ্যতে পুনর্বাসনের প্রশ্ন উঠলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় বনবাসীদের মতামত কীভাবে নিশ্চিত করা হবে?
এই প্রশ্নগুলি করা মানে বাঘের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো নয়।
এটাই প্রকৃত সংরক্ষণকে আরও শক্তিশালী করার প্রশ্ন।
বক্সার আসল পরীক্ষা এখন
বাঘের প্রত্যাবর্তন বক্সার জন্য ঐতিহাসিক ঘটনা।
কিন্তু বাঘের ছবি তুলে উৎসব করলেই সংরক্ষণ সম্পূর্ণ হয় না।
সংরক্ষণের আসল পরীক্ষা তখনই—
যখন বাঘের পাশাপাশি বনবাসীর শিশুটিও নিরাপদ ভবিষ্যৎ পাবে।
যখন জঙ্গলের পাশে থাকা পরিবারটি নিজের ঘর মেরামত করতে আইনকে শত্রু মনে করবে না।
যখন পর্যটক আসবেন, কিন্তু তাঁর খরচের বড় অংশ স্থানীয় অর্থনীতিতে ফিরে যাবে।
যখন গাড়িচালক, গাইড, হোমস্টে মালিক, দোকানদার এবং বনবাসী বুঝবেন—বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ তাঁদের জীবিকারও অংশ।
যখন বন দপ্তর ও বনবাসীর সম্পর্ক হবে শুধু নিষেধাজ্ঞা ও অনুমতির সম্পর্ক নয়—অংশীদারিত্বের সম্পর্ক।
অতন্দ্র প্রহরীর শেষ প্রশ্ন
বক্সা শুধু একটি Tiger Reserve নয়।
এটি একটি সীমান্তভূমি।
এটি একটি বনভূমি।
এটি একটি বন্যপ্রাণ করিডর।
এটি একটি পর্যটনভূমি।
এবং একই সঙ্গে এটি বহু মানুষের বসতভিটা, স্মৃতি, জীবন ও জীবিকার ভূগোল।
তাই বক্সাকে শুধু বাঘের চোখ দিয়ে দেখলে অর্ধেক বক্সাকেই দেখা হবে।
মানুষের চোখ দিয়েও দেখতে হবে।
বনবাসীর চোখ দিয়ে দেখতে হবে।
একজন গাড়িচালকের চোখ দিয়ে দেখতে হবে।
একজন হোমস্টে মালিকের চোখ দিয়ে দেখতে হবে।
একজন বনকর্মীর চোখ দিয়ে দেখতে হবে।
আর দেখতে হবে সেই শিশুটির চোখ দিয়েও—যার ভবিষ্যৎ এই বন আর মানুষের সহাবস্থানের উপর নির্ভরশীল।
বক্সায় বাঘ ফিরেছে—এটি আনন্দের খবর।
কিন্তু সেই আনন্দ যেন কোনও পরিবারের অন্নহীনতার কারণ না হয়।
সংরক্ষণ যেন অধিকারহীনতার অন্য নাম না হয়।
পর্যটন যেন বাইরের মানুষের ব্যবসা হয়ে স্থানীয় মানুষের জীবিকা কেড়ে না নেয়।
আর উন্নয়ন যেন বনবাসীকে তাঁর নিজের বনেই পরবাসী না করে।
বাঘ বাঁচবে।
বন বাঁচবে।
মানুষও বাঁচবে।
এই তিনটি যদি একসঙ্গে না বাঁচে, তাহলে বক্সার সংরক্ষণ-সাফল্যের গল্পটি অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।
কারণ—
“বক্সায় বাঘের প্রত্যাবর্তন হয়েছে। এবার দরকার মানুষের অধিকার, আস্থা ও জীবিকারও প্রত্যাবর্তন।”
অতন্দ্র প্রহরীর চেনা অচেনা—৫ এখানেই প্রশ্ন রেখে যায়—
“বনের মালিকানা কার?
সংরক্ষণের দায় কার?
আর বনের ভিতরে বসবাসকারী মানুষের ভবিষ্যতের দায় কে নেবে?”
-এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত বক্সার গল্প শেষ নয়। আশা করা যায় খুব দ্রুত এর সমাধান সূত্র খুঁজে পাওয়া যাবে।
